জ্ঞানচর্চায় অভিভাবক হারাল বাংলাদেশ
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক চলে গেলেন। ভিউজ বাংলাদেশ অভিভাবক-তুল্য শ্রদ্ধেয়-জনকে হারাল। ভিউজ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই তিনি আমাদের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস ছিলেন। নিয়মিত কলাম লিখেছেন ভিউজ বাংলাদেশে। তার একান্ত সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছি আমরা। যেখানে তিনি খোলামেলাভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেছেন। ভিউজ বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। তার প্রয়াণে ভিউজ বাংলাদেশ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত।
তার চলে যাওয়া, দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভিভাবক হারাল বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুনর্জাগরণের যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালে ‘লোকায়ত’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমরা জানি বাংলাদেশে প্রথম বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে। ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজ নামক প্রগতিশীল সংগঠনের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল হুসেন এবং কাজী আবদুল ওদুদ। এই আন্দোলনের মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। ওই পত্রিকার প্রচ্ছদে আন্দোলনের মূলমন্ত্র লেখা ছিল, ‘‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’’
মূলত সেই ‘শিখা’ পত্রিকার পরিবর্তিত রূপ ছিল অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত ‘লোকায়ত’। ২০১৫ সালে নিয়মিত প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ‘লোকায়ত’ বাংলাদেশে চিন্তা ও দর্শনের ‘রেনেসাঁ প্রকাশনা’ হিসেবেই বিবেচিত হতো। ‘লোকায়ত’ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে গভীরভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রগতিশীল চিন্তা তুলে ধরত। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চায় মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তাকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ‘লোকায়ত’। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থও আছে, যার নাম ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল’।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সারাজীবন গভীর জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন ছিলেন। তার প্রতিটি প্রবন্ধগ্রন্থ বাঙালির জ্ঞানচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার লেখা ‘মুক্তিসংগ্রাম’ গ্রন্থে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্মোহভাবে উঠে এসেছে। তার লেখা ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ ‘জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ’ ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’ গ্রন্থগুলোকে বিশ্বায়নের যুগে জটিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানবাধিকার, মানবিকতা-বোধ, বিশ্ব রাজনীতি ও জাতীয়তাদের সংকটের দিকগুলো গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উঠে এসেছে। তার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘রাজনৈতিক আদর্শ (বার্ট্রান্ড রাসেল)’। এটি মূলত বিশ্বখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘পলিটিক্যাল আইডিয়ালস’ গ্রন্থের অসাধারণ বাংলা অনুবাদ। এই গ্রন্থ নিছক অনুবাদ নয়, বরং প্রতিটি অধ্যায়ের সাবলীল ব্যাখ্যার মাধ্যমে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের মতাদর্শ অনুযায়ী পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্র যেভাবে কর্তৃত্বপরায়ন হয়ে ওঠে এবং মানুষের সৃজনশীলতা বিকাশের সব পথ রুদ্ধ করে কীভাবে পুঁজিবাদী শাসকরা একটি দাসত্বের সমাজ তৈরি করে, তার বিস্তৃত দিক তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যে বড় ধরনের সংকট শুরু হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের গ্রন্থগুলো বাতিঘর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ‘লোকায়ত’ আবারও ‘বুদ্ধির মুক্তি’র আন্দোলনের পথিকৃৎ হতে পারে। ‘লোকায়ত’-কে তার নিজস্ব ধারায় এগিয়ে নিতে পারলে মূর্খতা, কূপমণ্ডূকতাকে মুছে দিয়ে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানচর্চায় ছিলেন সম্পূর্ণ নির্মোহ, নিরপেক্ষে। কোনো পক্ষের প্রতি মতামত উৎপাদন কিংবা মতাদর্শ তৈরির মতো কোনো ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তিনি কখনোই জড়িত হননি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে বাংলা অ্যাকাডেমির সভাপতি নিয়োগ করা হয়। কিন্তু তিনি তার কলাম ও বক্তব্যে বারবার সরকারের সমালোচনা করেন এবং সংস্কার বা পরিবর্তনের নামে জনগণের মধ্যে নতুন বিভাজন বা মেরুকরণ তৈরি সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘সমর্পিত’ নীতিরও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। সত্যিকারের জ্ঞানচর্চা কী হওয়া উচিত সেটাই স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন তিনি। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক অমর হয়ে থাকবেন যুগ-যুগান্তরে, তার মননশীল সৃষ্টির সম্ভারে। তার বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ
মতামত দিন