Views Bangladesh Logo

শরৎ মানেই নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা

‘এসেছে শরৎ, হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার ’পরে’—রবীন্দ্রনাথের সেই শরৎ যেন বাংলার প্রকৃতির এক চিরচেনা ছবি। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোল, ভোরের ঘাসে শিশিরবিন্দু আর কোমল রোদের মায়া—শরৎ মানেই এমন এক ঋতুর আগমন, যার জন্য প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ই অপেক্ষা করে থাকে।

কিন্তু এবার সেই চেনা শরৎ যেন একটু ভিন্ন। বর্ষা বিদায়ের সঙ্গে আকাশে মেঘের ভেলা দেখা গেলেও বৃষ্টির দেখা মিলছে কম। ১৫ আগস্ট বর্ষা বিদায় নিয়ে রোববার থেকে শুরু হয়েছে শরতের ভাদ্র মাস। অথচ উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতি তখনও তপ্ত—কোথাও মৃদু তাপপ্রবাহ, কোথাও বৃষ্টিহীন শুকনো মাটি, আবার কোথাও বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং। সব মিলিয়ে শরতের আগমনী সুরের সঙ্গে বাস্তবতার ছবিটি বেশ বেমানান হয়ে উঠেছে।

আগস্ট মাসে উত্তরাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও মাসের অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র প্রায় ৯০ মিলিমিটার। এই ঘাটতির কারণে মাটির সোঁদা গন্ধের বদলে বাতাসে এখন অনুভূত হচ্ছে তাপের দহন। দিনের দীর্ঘ সময় জুড়ে সূর্যের তীব্রতা আর রাতে স্বস্তির অভাব—সব মিলিয়ে ঋতু পরিবর্তনের স্বাভাবিক ছন্দ যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় আগস্ট মানেই ছিল অবিরাম বৃষ্টি—ভরা নদী, প্লাবিত খাল, কাদামাটির পথ আর জলভেজা সবুজের সমারোহ। এখন সেই চিরচেনা ছবিতে ধীরে ধীরে ফাটল ধরছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছর ধরে উত্তরাঞ্চলে আগস্ট মাসের তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের আগস্টে যেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২১ থেকে ২৩ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রির মধ্যে, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রিতে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না—কৃষিজমি, জলাশয়, মাছ ও পশুপাখি সবকিছুতেই এর ছাপ পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা কমছে, ফলে কৃষকের সেচনির্ভরতা বাড়ছে। জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে গেলে মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ হ্রাস এই অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপরও প্রভাব ফেলছে। বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রবাহ ও মেঘের বলয়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশদূষণও উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। শহর ও জনপদে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে মাটি ও বাতাস ক্রমাগত দূষিত হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য, শিল্পকারখানার আবর্জনা, বাজারের পচনশীল সবজি এবং কসাইখানার বর্জ্য মিলে তৈরি হচ্ছে দূষণের নতুন এক বাস্তবতা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। রংপুর বিভাগে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। তপ্ত দিনের পর বিদ্যুৎহীন রাত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকা—কোথাও যেন স্বস্তি নেই। গরম, ঘাম আর অস্বস্তির সঙ্গে বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আরেক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, চলতি আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরেই এই অঞ্চলে উষ্ণতা বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাত হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, মেঘের বলয় সরে যাওয়া ও পরিবেশদূষণ—এসব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে।

তবু শরৎ এসেছে। আকাশে হয়তো একদিন আবার তুলোর মতো মেঘ ভেসে উঠবে, কাশফুলের শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়বে নদীর ধারে, শিশির জমবে ঘাসের ডগায়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রকৃতি যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ শরৎ শুধু নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ঋতু নয়—এটি প্রকৃতির ভারসাম্যেরও এক আয়না। সেই আয়নায় যদি তাপ বাড়তে থাকে, নদী শুকিয়ে যায়, বৃষ্টি কমে আসে আর জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে থাকে, তবে একদিন হয়তো শরতের সৌন্দর্য থাকবে—কিন্তু তার চিরচেনা কোমলতা আর থাকবে না।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ