দলিল নিবন্ধন অটোমেশন হচ্ছে, আদালতে বসেই যাচাই করা যাবে নথিপত্র
দেশের দলিল নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজড করার অংশ হিসেবে অটোমেশন করা হচ্ছে দলিল নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের আন্তঃসংযোগ কার্যক্রমকে অধিক ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি আন্তঃসংযোগ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন করছে। একই সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের স্মার্ট ভূমিসেবা ব্যবস্থার সব নথিপত্র আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে শেয়ার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে আদালতে বসেই জজ এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা ভূমিবিষয়ক নথিপত্র যাচাই করতে পারবেন।
জানা গেছে, ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প এবং ১ হাজার ২১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প গ্রাহকের ১৭ ধরনের সেবা নিশ্চিত করবে। প্রকল্প দুটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হওয়ার পর ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন কাজ শুরু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকের ১৭ ধরনের সেবা পেতে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। সেবাগুলো হচ্ছে- মিউটেশন, রিভিউ ও আপিল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর, রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা ব্যবস্থাপনা, মিউটেটেড খতিয়ান, ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ ডেলিভারি সিস্টেম, মিস মামলা ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা, দেওয়ানি মামলা তথ্য ব্যবস্থাপনা, হাটবাজার ব্যবস্থাপনা, জলমহাল ব্যবস্থাপনা, বালুমহাল ব্যবস্থাপনা, চা বাগান ব্যবস্থাপনা, অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ বাজেট ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ‘ল্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস ফ্রেমওয়ার্ক’ সিস্টেম সফটওয়্যারের মাধ্যমে একই কাঠামোয় নিয়ে এসে আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডেটাবেইজ তৈরি করে সরকারের অন্যান্য সব সেবার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এ ছাড়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ করতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পে স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে, নির্ভুলভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ করতে তিনটি পার্বত্য জেলা ছাড়া সারা দেশের ৪৭০টি উপজেলার মৌজা পর্যায়ে জিওডেটিক সার্ভের মাধ্যমে ২ লাখ ৬০ হাজার ৩১০টি জিও-রেফারেন্সিং পয়েন্ট নির্ধারণ ও ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৮৮টি মৌজা ম্যাপের ডেটাবেইজ প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত জিও-রেফারেন্স করা মৌজা ম্যাপ উল্লেখিত ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন’ প্রকল্পে সরবরাহ করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, ভূমি জরিপ কার্যক্রমটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিষয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন করতে সময় লেগেছে ২০ থেকে ২৫ বছর। এ প্রকল্পটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যাশিত সেবাগ্রহীতা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে না গিয়ে ঘরে বসে মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেবা পাবেন। প্রকল্পের আওতায় সফটওয়্যার ব্যবহার করে দেশের ভূমি-সংক্রান্ত ৫ হাজার ২৪৭টি অফিসের একসঙ্গে অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক ভূমিসেবা চালু করা সম্ভব হবে বলে ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বিদ্যমান ভূমি অফিসগুলোর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দূরীকরণে সেবা কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ভূমিসেবা ডিজিটালাইজেশনের কার্যক্রমকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর চলমান ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম ও ভূমি আইন সম্পর্কে পারদর্শী করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং দেশের সব ভূমি অফিসে ডিজিটাল ডিভাইস প্রদান করা হয়েছে, যাতে সেবা প্রদান দ্রুত এবং ত্রুটিমুক্ত হয়। বর্তমানে সাধারণ নাগরিকরা ভূমি অফিসে না এসে নামজারির আবেদন, অনলাইনে সার্টিফায়েড পর্চা ও মৌজা ম্যাপের জন্য আবেদন করতে পারছেন এবং ঘরে বসেই খতিয়ান বা ম্যাপ পেয়ে যাচ্ছেন ও খাজনা দিতে পারছেন। যে কোনো ভূমিসেবা সম্পর্কে জানতে বা অভিযোগ জানাতে হটলাইনে (১৬১২২২) কল করতে পারছেন। ভূমি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ভূমি মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে, বন্ধকি (মর্টগেজ) জমি পুনরায় বন্ধক দেওয়া, কেনাবেচা বা নামজারি সংশ্লিষ্ট জালিয়াতি ও প্রতারণা রোধে চালু করা হয়েছে ‘মর্টগেজ ডেটা ব্যাংক’। এর মাধ্যমে ব্যাংক, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস বা নাগরিকদের জমির বন্ধক-সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে যাচাই করার সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে বন্ধককৃত জমি নতুন করে বন্ধক, ক্রয়-বিক্রয় বা নামজারি করার সুযোগ না থাকে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নামজারি সহজীকরণে বন্ধকী ডেটাবেইজকে ব্যবহার করা যাবে। এতে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য তথ্য সংগ্রহ সহজ হবে এবং ঝুঁকি হ্রাস পাবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। জমির মালিকদের জমির যাবতীয় তথ্য-সংক্রান্ত স্মার্ট কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কার্ডে মালিকানার সব ডিজিটাল তথ্য থাকবে।
ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, ‘ভূমি ব্যবহার ও মালিকানা স্বত্ব’ আইনের খসড়া চূড়ান্তকরণের পথে। ‘ভূমি ব্যবহার ও মালিকানা স্বত্ব আইন’-এর আওতায় নাগরিকদের ‘সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড ওনারশিপ’ তথা সিএলও নামক একটি ডকুমেন্ট দেওয়া হবে, যেখানে ভূমি মালিকানার সব তথ্য থাকবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে