আদালত চত্বরে আসামিকে হেনস্তা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী, বলছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে গত শনিবার বিকেলে সিলেটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাকে তোলা হয়। টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশের গাড়ি থেকে নামার পরই সাবেক এই বিচারপতির ওপর হামলে পড়েন একদল আইনজীবী।
পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই বিচারপতি মানিকের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা এবং তার দিকে জুতা ছুড়ে মারেন আইনজীবীরা। একপর্যায়ে নিরাপত্তার জন্য ওই বিচারপতিকে পুলিশের দেওয়া হেলমেটটি খুলে ফেলে। এই অবস্থায় প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কির মধ্যে টেনে হিঁচড়ে তাকে আদালত ভবনে প্রবেশ করানো হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন।
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৭১ টিভির সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারাজানা রূপাকে গত ২২ আগস্ট আদালতে হাজির করার সময় ফারজানা রূপাকে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই কিল-ঘুসি মারা হয়। তার স্বামী শাকিল আহমেদ সে সময় চিৎকার করে এই ঘটনার বিচার চান। তার আগে সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডা. দীপু মনিকে মোহাম্মদপুর থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত এলাকায় তার ওপর চড়াও হন এক দল আইনজীবী। তার ওপর ডিম নিক্ষেপ ছাড়াও, শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। ওই সময় আইনজীবী ও পুলিশ ছাড়া বাইরের কোনো লোককে দেখা যায়নি। দীপু মনি আদালত কক্ষে কাঁদছিলেন।
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান আদালতে হাজির করা হলে আদালত চত্বরে তারা হেনস্থার শিকার হন। তাদের দিকে ডিম ও জুতা নিক্ষেপ করেন আইনজীবীরা। এইসব ঘটনায় আসামিদের ঘিরে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিত দেখা গেলেও আক্রমণ থেকে তারা রক্ষা পাননি। আর এক্ষেত্রে অভিযোগের তীরটি বিএনপন্থী আইনজীবীদের দিকে।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপির সাবেক এমপি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি বিগত সরকারের মন্ত্রী এমপিদের আদালতে হাজির করার খবর পেলেই একদল উৎসুক আইনজীবী আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। হাজতখানা থেকে যখন আদালতে হাজির করা হয় তখন তারা আসামিদের ঘিরে ধরে নানা স্লোগান ও কটূক্তি করেন। হেনস্থা করেন। তাদের বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ ও ঘৃণা তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আদালত এলাকায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আর ঘৃণার কারণেই অনেক আসামি আইনজীবী পাচ্ছেন না। তাদের পক্ষে আইনজীবীরা দাঁড়াচ্ছেন না। তবে তাদের নিরাপত্তাহীনতা ও ঘৃণা প্রশমনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা। তারা যাতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা। সেটা না করা হলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলীকে আমি উদ্বেগজনক বলে মনে করি। যেকোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার প্রাপ্তি যেমন অধিকার তেমনি তার নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব। আটক ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করার সময় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার যাতে করে এই ধারণা তৈরি না হয় যে, তিনি ন্যায়বিচার বঞ্চিত হতে পারেন।’
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এ ব্যাপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখানে পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থায় যারা আছেন তাদের আদালত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। নিরাপদ করতে হবে। এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছি।’
গত ২২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলামকে আইনজীবী ভবনে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা ভয়ের কারণে আসতে পারছেন না বলে দাবি করছেন অনেকে। এ ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য আমরা সর্বদা সচেষ্ট। ব্যক্তিস্বার্থে সংগঠনের কেউ অপেশাদার সুলভ আচরণ করলে, বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ইতিমধ্যে একজনকে বহিষ্কারের পাশাপাশি আরও কিছু সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিলুপ্ত করা হয়েছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখা। ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।’
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত চত্বরে হামলা মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস কাজল। তবে সেইসঙ্গে তিনি আসামিদের নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আসামির ওপর হামলা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আইনজীবীরাও চড়াও হচ্ছেন। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও সম্প্রতি আদালত চত্বরে আমাসির ওপর হামলার ঘটনাকে বিচারের আগে বিচার করে ফেলা বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এতে করে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে