Views Bangladesh Logo

মামলার জট কমছে, নাকি শুধু ফাইল সরছে?

আদালতের বারান্দায় জমে থাকা ফাইল যেন সময়ের স্তরে স্তরে চাপা পড়ে থাকা মানুষের অপেক্ষা। একটি মামলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, কখনো একটি সম্পত্তি, কখনো স্বাধীনতা কিংবা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সেই অপেক্ষার ভার কমানোর লক্ষ্যেই ২০২৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে। বছরের প্রথম আট মাসেই আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা। নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি বেশি হওয়ায় কমেছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও। কিন্তু আদালতের দরজায় বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকা বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষা কি সত্যিই কমেছে? নাকি পুরোনো ফাইল সরিয়ে সংখ্যার খাতা হালকা হয়েছে? মামলা নিষ্পত্তির এই দ্রুততার আড়ালে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বিচার শেষ হচ্ছে, নাকি শুধু ফাইলের হিসাব?

সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আপিল বিভাগে নতুন মামলা হয়েছে ৯ হাজার ১৩৯টি। বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি। অর্থাৎ দায়েরের চেয়ে ১ হাজার ৯৯৭টি বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বছরের শুরুতে ৪১ হাজার ৫৫১টি বিচারাধীন মামলা থাকলেও আগস্ট শেষে তা নেমে এসেছে ৩৯ হাজার ৫৫৪টিতে।

শুধু চলতি বছরের চিত্র নয়, আগের পাঁচ বছরের তুলনাতেও নিষ্পত্তির এই সংখ্যা বড়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে যথাক্রমে ৬ হাজার ৮৫৯, ৫ হাজার ৪০৬, ৫ হাজার ৩৪৯, ৫ হাজার ৩১২ ও ৭ হাজার ৫৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। পাঁচ বছরের বার্ষিক গড় ছিল প্রায় ৬ হাজার ৯৬টি। অথচ ২০২৬ সালের আট মাসেই সেই গড়ের প্রায় দ্বিগুণ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

হাইকোর্ট বিভাগের চিত্র আরও বড়। প্রথম আট মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা, যেখানে নতুন মামলা হয়েছে ৭৪ হাজার ৬০৭টি। অর্থাৎ দায়েরের চেয়ে ১২ হাজার ৯৮৯টি বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বছরের শুরুতে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি বিচারাধীন মামলা থাকলেও আগস্ট শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬টিতে।

বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে নিষ্পত্তির গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই দুই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২ হাজার ২৯৭টি মামলা। ২০২৫ সালের পুরো বছরে হাইকোর্টে যেখানে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

তবে এই সাফল্যের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীদের কেউ কেউ। মানবাধিকার নেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজের মতে, আপিল বিভাগের কিছু পেন্ডিং মামলা দ্রুত শুনানির জন্য অধস্তন আদালতে পাঠানো হয়েছে। ফলে পরিসংখ্যানে যেগুলো নিষ্পত্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর সবকটিকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বলা যায় না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুকও হাইকোর্টের নিষ্পত্তির বড় অংশ পুরোনো মামলার ফাইলভিত্তিক নিষ্পত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে- দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মামলাগুলো একসঙ্গে নিষ্পত্তি হওয়ায় সংখ্যাটি বেড়েছে।

আরেক সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলের অভিযোগ, ‘স্টেপ নট টু বি টেকেন’ ধরনের বহু পুরোনো মামলা একটি কমন অর্ডারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। ফলে সংখ্যাগত নিষ্পত্তি বাড়লেও বাস্তবে বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষার অবসান কতটা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।' ব্যারিস্টার বাদল মনে করেন, মামলার স্থায়ী জট কমাতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিচারক। তাঁর মতে, বিচারকের সংখ্যা না বাড়ালে একটি বেঞ্চের ওপর বিপুল মামলার চাপ থেকেই যাবে।

এখাননেই প্রশ্ন- সুপ্রিম কোর্টের এই গতি কি ছড়িয়ে পড়বে দেশের নিম্ন আদালতগুলোতেও? কারণ বিচারব্যবস্থার স্রোত কেবল সর্বোচ্চ আদালতের দুয়ারে থেমে থাকে না। উচ্চ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হলেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধস্তন আদালতের মামলা, সাক্ষ্য, নথি, জামিন, আপিল কিংবা পুনঃশুনানির প্রভাব থেকে যায়। ফলে সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান কমা মানেই সার্বিক বিচারজট কমে যাওয়া, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রয়োজন পুরো বিচারব্যবস্থার চিত্র দেখা।

মামলার সংখ্যা কমছে, এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে আসল সাফল্য একটি সংখ্যার ঘরে নয়; শেষ শুনানির পর আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্তে, যখন তিনি বলতে পারেন- ‘অবশেষে বিচার পেলাম।’ সুপ্রিম কোর্টের দ্রুততার সেই ঢেউ যদি অধস্তন আদালতের দীর্ঘ করিডরেও পৌঁছায়, তবেই মামলা জট কমার এই পরিসংখ্যান বাস্তব অর্থে মানুষের স্বস্তির গল্প হয়ে উঠবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ