Views Bangladesh Logo

দু’দিনের খেলা মিস করলেন গ্রাহকরা, বড় অংক ঢুকল গ্রামীণফোনের অ্যাকাউন্টে

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ দু’দিনের বিশ্বকাপ ম্যাচ মিস করলেন গ্রামীণফোনের ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ পাস ক্রেতারা। তবে বড় অংকে সমৃদ্ধ হয়েছে গ্রামীণফোনের অ্যাকাউন্ট।

সাবসক্রিশন ফি দিয়েও খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই একটি মেসেজ ছাড়া ডিভাইসের পর্দায় আর কিছুই দেখছিলেন না। আবার সেই মেসেজেও গ্রামীণফোন কোন দুঃখ প্রকাশ কিংবা কারিগরী ত্রুটির কথা বলেনি। উল্টো মেসেজে দায়ী করা হয়েছে গ্রাহকদেরই। মেসেজে লেখা ছিল, ‘ডিভাইস লিমিট ‍রিচড)।”অর্থাৎ, যদি কোন গ্রাহক সাবসক্রিপশন ফি দেওয়ার পরও সার্ভিস না পাওয়ার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষের সহজ উত্তর হবে, ”এই গ্রাহক একটি প্যাকেজজের আওতায় কয়েকটি ডিভাইস কানেক্ট করার কারনে ‘ডিভাইস লিমিট রিচড’ নোটিফিকেশন এসেছে।”

যদিও ভিউজ বাংলাদেশের প্রশ্নের জবাবে গত দুই দিনে কিছু সময় ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ প্যাকেজ ঘিরে কারিগরী ত্রুটির কথা স্বীকার করেছে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর দিন অর্থাৎ গত ১১ মে থেকে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ পাস’ নামে তিনটি প্যাকেজ ছাড়ে গ্রামীণফোন প্রথম প্যাকেজ ২৪ ঘন্টার জন্য, দাম ২৮ টাকা, দ্বিতীয় প্যাকেজ ৭ দিনের জন্য ১২৭ টাকা এবং তৃতীয় প্যাকেজ ৪৫ দিনের জন্য১৯৯ টাকা। এই পাস দিয়ে গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ প্লাটফরম থেকে ফিফা বিশ্বকাপের খেলার স্ট্রিমিং দেখা যাবে বলে জানানো হয়।

একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় কোন জাতীয় বা বৈশ্বিক ইভেন্ট সামনে রেখে এ ধরনের প্যাকেজ দেওয়ার রীতি আছে। এ ধরনের প্যাকেজে টার্গেট সাবসক্রাইবার হচ্ছে ‘মোবাইল’ গ্রাহকরা। যারা পেশাগতভাবে এমন কোন কাজে ব্যস্ত থাকেন যেখানে টিভি দেখার সুযোগ নেই, কিংবা ভ্রমণে থাকেন, সেই গ্রাহকরাই এ ধরনের প্যাকেজ কেনেন সাময়িক সময়ের জন্য তার মোবাইল হ্যান্ডসেটের পর্দায় খেলা দেখার জন্য। এ ধরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম টাকার প্যাকেজ বেশী বিক্রি হয়। গ্রামীণফোনের তিনটি প্যাকেজের মধ্যে নিঃসন্দেহে ২৪ ঘন্টার মেয়াদের ২৮ টাকার প্যাকেজ বেশী বিক্রি হওয়ার কথা। বাকী দু’টো প্যাকেজের মধ্যে সাত দিন মেয়াদের গ্রাহকদের প্যাকেজের গ্রাহক অবশ্যই ৪৫ দিনের গ্রাহকের চেয়ে বেশী হবে।

অভিজ্ঞ এই সাবেক মোবাইল অপারেটর কর্মকর্তা আরও জানান, কোন নির্দিষ্ট প্যাকেজ বা সার্ভিসের ক্ষেত্রে কোন কারনে ‘ টেকনিক্যাল এরর’ হলে গ্রাহকরা কি ধরনের টেক্সট নোটিফিকেশন দেখবেন সেবা আগে থেকেই সার্ভারে লিখে রাখা হয়। ‘টেকনিক্যাল এরর’ হলে প্রত্যেক গ্রাহক একই ধরনের নোটিফিকেশন পাবেন। অর্থাৎ, ফিফা ‘ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ পাস’ প্যাকেজে ‘টেকনিক্যাল এরর’ এর ক্ষেত্রে যে নোটিফিকেশন এসেছে সেটা আগে থেকেই সার্ভারে লিখে রাখা হয়েছে বলেই গ্রাহকরা দেখতে পেয়েছেন। এক্ষেত্রে সাধারনত, লেখা হয়, ‘কারগিরী ত্রুটির কারনে সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ কিন্তু এই মেসেজ না দিয়ে ‘ডিভাইস লিমিট রিচড’ মেসেজে দেওয়ার একটা কারন হতে পারে বিগত দিনের অভিজ্ঞতা। বিগত দিনে আইনগত মোকাবেলা করতে গিয়ে দেখা গেছে, এ ধরনের নোটিফিকেশনের মেসেজের স্ক্রিনশট প্রমাণ হিসেবে উপস্থান করা হয়েছে। ফলে এমন একটি নোটিফিকিশেন মেসেজ দেওয়া হয়েছে, যেখানে টেকনিক্যাল এররের জন্য সরাসরি গ্রাহককেই দায়ী করা হয়েছে। ফলে এই নোটিফিকেশন ভবিষ্যতে আদালতে গ্রামীণফোনের টেকিনিক্যাল এররের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ থাকছে না। এ ধরনের নোটিফিকেশণ কে ‘চিট নোটিফিকেশন’ বা সহজ বাংলায় ‘প্রতারণা’ বলা যেতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের কিংবা স্বল্প মেয়াদের প্যাকেজ গ্রাহকরারাই গত দু’দিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশী। ২৪ ঘন্টা মেয়াদের প্যাকেজ কেনা গ্রাহকের প্যাকেজ মূল্যের ২৮ টাকার পুরোটাই গচ্চা গেছে। প্রায় ১০ কোটি গ্রাহকের গ্রামীণফোনের এক লাখ গ্রাহকও যদি এই প্যাকেজ কিনে থাকেন তাহলে এই এক লাখ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এক দিনেই গ্রামীণফোনের অ্যাকাউন্ট সমৃদ্ধ হয়েছে ২৮ লাখ টাকায়। গ্রাহক সংখ্যা যত বেশী হবে গ্রাহকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সংখ্যা আরও বাড়বে এবং গ্রামীণফোনের অ্যাকউন্টের সমৃদ্ধিও ততই বাড়তে থাকেবে।

অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ফরহাদ নামে তেজগাঁও এলাকার একজন গ্রাহক জানান, তিনি রাতে কর্মস্থলে কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্মার্টফোনে খেলা দেখার জন্য গ্রামীণফোনের ১২৭ টাকা মেয়াদের সাত দিনের ‘ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ পাস’ প্যাকেজ নিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘ডিভাইস রিচড লিমিটস’ মেসেজ দেখতে পান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে দুই-তিন মিনিটের জন্য অনুষ্ঠান দেখা গেলেও পুরো খেলার সময় জুড়েই একই বিরক্তিকর মেসেজ দেখতে হয়েছে। তিনি জানান, দ্বিতীয় দিনেও কানাডা-বসনিয়া ম্যাচ শুরুর দুই-তিন মিনিটের মধ্যেইিআগের দিনের মত একই ধরনের নোটিফিকেশন আসে। ফলে খেলা দেখা আর হয়নি। তার আশংকা প্যাকেজের মেয়াদের বাকী পাঁচ দিনও সম্ভবত, এ ধরনের নোটিফিকেশন দেখেই পার করতে হবে!

অবশ্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ভিউজ বাংলাদেশের প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘‘একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি ত্রুটির কারণে কিছু গ্রাহক বায়োস্কোপ+ প্ল্যাটফর্মে ফিফা বিশ্বকাপ স্ট্রিমিংয়ের সময় বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। আমাদের টিম বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুততম সময়ে সেবা স্বাভাবিক করতে কাজ করেছে। এ কারণে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। একই সঙ্গে গ্রাহকদের ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক আবু নজম তানভীর হোসাইন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘টেকনিক্যাল এরর হচ্ছে মোবাইল অপারেটরের ফল্ট বা ভুল। এ কারনে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের যথাযথভাবে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, শুধু দুঃপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘যে গ্রাহক উদ্বোধনী ম্যাচ দেখার জন্য ২৪ ঘন্টা মেয়াদের প্যাকেজ নিয়েছিলেন, তার বেলায় ক্ষতিটা অপূরণীয়। কারন তিনি নির্দিষ্ট দিনে সুনির্দিষ্ট ম্যাচ দেখার চিন্তা করেই স্বল্প মেয়াদের প্যাকেজ নিয়েছিলেন। আর একটা ম্যাচ দেখার সুযোগ দিলেই কি এই ক্ষতি পূরণ হয়? এ কারনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসি’র বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে অবশ্যই জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে এবং আইনে যে ধরনের বিধি বিধান প্রয়োগ করা যায় সেগুলো প্রয়োগ করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ