Views Bangladesh Logo

বিশ্বকাপের বাইরে বিকল্প টুর্নামেন্টের ছক, ফিফায় কি ভাঙনের সুর?

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই এসেছে—ফিফার সভাপতি তাঁর নিজের তিন সহসভাপতির প্রকাশ্য অনাস্থার মুখে, আর সেই বিরোধিতা গড়াচ্ছে বিশ্বকাপের বিকল্প আয়োজনের ভাবনা পর্যন্ত। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বে অংশীদার বিক্রির ব্যর্থ উদ্যোগ এখন কেবল একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের বিতর্ক নয়; এটি রূপ নিয়েছে ক্ষমতা, আস্থা ও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্য সংঘাতে। উয়েফা, এএফসি ও কনক্যাকাফের প্রধানরা এরই মধ্যে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন এবং তাঁর নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিও সামনে এনেছেন।

সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি এসেছে অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে ফুটবলারদের জন্য ফিফার বাইরে বিকল্প প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছেন এই তিন কনফেডারেশনের শীর্ষ নেতারা। এখনো কোনো টুর্নামেন্টের নাম, কাঠামো বা অংশগ্রহণকারী নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিকল্প মঞ্চ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াটাই দেখিয়ে দিচ্ছে—ফিফার অন্দরমহলের সংকট কতটা গভীরে পৌঁছেছে।

আর এখানেই প্রশ্নটি কেবল ইনফান্তিনো থাকবেন কি না, সেটিতে আটকে থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে, তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি কি বিশ্ব ফুটবলের প্রচলিত কাঠামোকেই ভেঙে দেওয়ার মতো পর্যায়ে যাচ্ছে? তিন মহাদেশের ফুটবলশক্তি যদি সত্যিই বিশ্বকাপ বর্জনের পথে হাঁটে, তবে ফিফার সবচেয়ে বড় সম্পদ বিশ্বকাপের সর্বজনীনতা, তা প্রথমবারের মতো সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ঘটনার শুরু ফিফার একটি উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বে অংশীদার বিক্রির প্রস্তাব সামনে আসতেই ইউরোপীয় ফুটবলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উয়েফার ৫৫ সদস্য জরুরি বৈঠকে বসে এবং বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। চাপের মুখে ফিফা শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে এবং ইনফান্তিনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান। কিন্তু সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেও ক্ষত সারেনি; বরং তা আরও বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

উয়েফার কঠোর অবস্থানের পাশে দাঁড়িয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনক্যাকাফ। যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন, এএফসি সভাপতি সালমান বিন ইব্রাহিম ও কনক্যাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তালিয়ানি—তিনজনই ফিফার সহসভাপতি। তাঁদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি শব্দ—আস্থা। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্বকাপের অংশীদার বিক্রির প্রক্রিয়ায় ইনফান্তিনো সেই আস্থা ভেঙেছেন।

এই চিঠির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো স্বাধীন তদন্তের দাবি। বাতিল হয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াটি কীভাবে এগিয়েছিল, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সেখানে কী ধরনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন তিন কনফেডারেশনের নেতারা। ফলে এটি এখন আর কেবল নীতিগত মতবিরোধ নয়; ফিফা সভাপতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প টুর্নামেন্টের ভাবনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকাপ বর্জন করা হলে ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখা হবে—এমন পরিস্থিতি এড়াতেই বিকল্প আয়োজনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো বা প্রতিযোগিতার রূপরেখা নেই। সংশ্লিষ্ট নেতারা সম্ভাব্য সব পথ খোলা রাখছেন।

ইনফান্তিনোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অবশ্য সামনে মার্চের ফিফা কংগ্রেস। ২১১ সদস্যদেশের ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ১০৬ ভোট। উয়েফা, এএফসি ও কনক্যাকাফের সদস্যদেশ মিলিয়ে সংখ্যা ১৪৩। অর্থাৎ তিন কনফেডারেশন একসঙ্গে বিরোধিতায় থাকলে ইনফান্তিনোর জন্য সমীকরণ কঠিন হওয়ার কথা। সভাপতি পদে প্রার্থিতা জমা দেওয়ার সময়সীমা ১৮ নভেম্বর।

তবে ভোটের অঙ্ক এত সরল নয়। ফিফার প্রতিটি সদস্যদেশের ভোট একটি করে। উয়েফার হাতে ৫৫ ভোট থাকলেও অন্য পাঁচ কনফেডারেশনের মোট ভোট ১৫৬। অর্থাৎ ইউরোপীয় ফুটবলের মাঠের শক্তি ফিফার নির্বাচনী অঙ্কে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রূপ নেয় না। ইনফান্তিনোকে সরাতে হলে উয়েফাকে তাই অন্য কনফেডারেশনগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

সেই জায়গাতেই ইনফান্তিনোর পাল্টা শক্তি। মরক্কোয় সাম্প্রতিক বৈঠকে ফিফার কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) ও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ)ও তাঁর পাশে রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, কাতার ও কুয়েত তাঁর প্রতি সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ফলে সামনে এখন দুটি লড়াই—একটি ভোটের, অন্যটি বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ কাঠামোর। ইনফান্তিনো তাঁর পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত। বিপরীতে তিন মহাদেশের ফুটবল নেতৃত্ব বলছে, আস্থার সংকট কেবল ক্ষমা চেয়ে মেটার নয়। এর মধ্যে যদি বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি বাস্তব রূপ পায় এবং বিকল্প টুর্নামেন্টের আলোচনা এগিয়ে যায়, তবে সংকটটি আর ফিফার সভাপতির পদ নিয়ে থাকবে না।

তখন প্রশ্ন উঠবে আরও বড়—বিশ্ব ফুটবলের জন্য কি একটি বিশ্বকাপই যথেষ্ট, নাকি ফিফার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত জন্ম দেবে আরেকটি বিশ্বমঞ্চের? আপাতত উত্তর অজানা। কিন্তু ফিফার ইতিহাসে এই মুহূর্তটি যে শুধু আরেকটি প্রশাসনিক বিরোধ নয়, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ