Views Bangladesh Logo

রাষ্ট্রপতির মর্যাদা খর্বের অভিযোগ: সংবিধান উপেক্ষা করেছেন ড. ইউনূস?

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গুরুতর সাংবিধানিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, বিদেশ সফর এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেননি। এমনকি ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রেও অবহিত করেননি রাষ্ট্রপতিকে। তার এই অভিযোগ সত্য প্রমানিত হলে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মো. ইউনূসের ওইসব কর্মকাণ্ড বেআইনী ও অসাংবিধানিক বলে বিবেচিত হবে। এমনটাই জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ( নির্দিষ্ট সময়ে প্রধান উপদেষ্টার) মাধ্যমে প্রয়োগ হয়। রাষ্ট্রপতি সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর বা তার পদমর্যাদার ব্যাক্তির পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুসারে। তবে ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা তার রাষ্ট্রীয় যেকোনো সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করতে বাধ্য।
তবে এখানেই শেষ নয়। সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করবেন এবং রাষ্ট্রপতি চাইলে যে কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রধান নন। তিনি সাংবিধানিকভাবে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারী এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখেন।

রাষ্ট্রপতির অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা বিদেশ সফর শেষে কখনো তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বা লিখিতভাবে কোনো প্রতিবেদন দেননি। যদি সত্যিই সংবিধানের ৫৫(৬)–এর বাধ্যবাধকতা উপেক্ষিত হয়ে থাকে, তবে তা সাংবিধানিক প্রটোকলের পরিপন্থী বলে গণ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি ভিউজ বাংলাদেশেকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টার আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা তিনি প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, যদি তিনি সন্তুষ্ট হন যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি যদি যথাযথ তথ্য না পান বা সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে অধ্যাদেশ জারির সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ আহসানুল করিম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হলেও তিনি তা জানতেন না। আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান সরাসরি রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমোদনের কথা উল্লেখ না করলেও, কার্যনির্বাহী শাখা রাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তি করে থাকে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান হিসেবে এ ধরনের বিষয়ে অবহিত থাকবেন। পূর্ববর্তী সরকারপ্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছেন—রাষ্ট্রপতির এমন বক্তব্য প্রথাগত সাংবিধানিক রীতির দিকে ইঙ্গিত করে। সাংবিধানিক রীতিনীতি (constitutional conventions) লিখিত বিধানের বাইরে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ। যদি অভিযোগ ওঠে যে অধ্যাদেশ বা আন্তর্জাতিক চুক্তি যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া হয়েছে, তাহলে আদালতে সেগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। আদালত অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে চুক্তিগুলো বাতিল হতে পারে।


বিদেশ সফর ও প্রটোকল সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির অভিযোগের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, প্রধান উপদেষ্টা ১৪–১৫ বার বিদেশ সফরে গেলেও কখনো রিপোর্ট করেননি। সংবিধানে সরাসরি বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ বাধ্যতামূলক বলা না থাকলেও, প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই অবহিতকরণ মৌখিক বা লিখিত—দুইভাবেই হতে পারে। যদি প্রধান উপদেষ্টা ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রপতিকে এড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন, তাহলে তা প্রশাসনিক প্রটোকল লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।’ রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর বাতিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেছেন যে তার কসোভো সফর এবং কাতারের আমিরের আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ আটকে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর সাধারণত সরকারের পরামর্শ ও প্রস্তুতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের খসড়া চিঠি প্রস্তুত করে তার কাছে পাঠানো এবং সই করতে বলা—এটি শিষ্টাচারবহির্ভূত। রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন এটি তার সাংবিধানিক মর্যাদার অবমূল্যায়ন, তবে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রটোকলের প্রশ্ন উত্থাপন করে।’বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের রাষ্ট্রপতিকে যেতে না দেওয়ার বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতির সমাবর্তনে উপস্থিত থাকা একটি দীর্ঘদিনের প্রথা। যদি তাঁকে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন না হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচারের ব্যত্যয় হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এ ব্যাপারে নবনিযুক্ত আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশেকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গুরুতর সাংবিধানিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন। এক্ষেত্রে যদি ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা মানা না হয়ে থাকে, তবে তা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা হতে পারে। অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে প্রক্রিয়াগত বৈধতা থাকলেও নৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিদেশ সফর ও আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়ে অবহিত না করা সরাসরি আইনি অপরাধ না হলেও তা রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা খর্ব করে।’ রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী তাঁকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এমন অভিযোগের ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাহী নন, তবে তিনি সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতীক। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছিল তাকে নিয়মিত অবহিত রাখা। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সাংবিধানিক কাঠামোর ভারসাম্য ও শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাই সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মো. ইউনুসের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনে সব অভিযোগ তদন্ত করা হতে পারে। এর পরের বিষয়টি বর্তমান সরকার দেখবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ