ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
৩০০ আসনের এক তৃতীয়াংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ, নজরদারিতে ২৫ হাজার কেন্দ্র
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের যৌথ মূল্যায়নে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ১৩টি সংসদীয় আসনকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে ৮,৭৪৬টি ভোটকেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং আরও ১৬,৩৫৯টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আরো ৮৫টি আসন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতীতের সহিংসতার ইতিহাস, প্রভাবশালী প্রার্থীদের মুখোমুখি লড়াই ও স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় গ্রুপিংয়ের কারণে এসব আসনে সহিংসতা ও উত্তেজনার আশঙ্কা করা হচ্ছে এবারের নির্বাচনে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৩ আসন
পুলিশের বিশেষ শাখা ও ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো হলো- পাবনা-১, পাবনা-৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-৪, কুমিল্লা-১১, নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৬। এসব আসনে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার মোতায়েনের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও রিজার্ভ টিম প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভাগ ভিত্তিক ঝুঁকির চিত্র
রংপুর বিভাগ
রংপুর বিভাগের একাধিক আসন ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুর-৪, রংপুর-৫, ঠাাকুরগুঁ-১, ঠাকুরগাঁও-৩, কুড়িগ্রাম-২, পঞ্চগড়-১ ও নীলফামারি-১, নীলফামারী-২, জয়পুরহাট-১ ও লালমনিরটাট-৩ । এসব এলাকায় অতীতে নির্বাচনী সহিংসতা ও দলীয় কোন্দলের ইতিহাস রয়েছে। বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় শতাধিক ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগ
রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী-২ ও রাজশাহী-৪, নওগাঁ-৪, নওগাঁ-৫ ও বগুড়া-৪, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭, সিরাজগঞ্জ-১ ও ২, পাবনা, ৩ ও নাটোর-১ ও ৩ আসন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিভাগে শতাধিক ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে কেন্দ্র দখল ও সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। রাজশাহী ও বগুড়া শহরের প্রায় সবগুলো কেন্দ্র আছে ঝুঁকিতে।
ঢাকা বিভাগ
ঢাকা বিভাগে ঝুঁকি সবচেয়ে ব্যাপক। ঢাকা মহানগরের প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। আসনের দিক থেকেও আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা বিভাগে।
ঝুঁকিপূর্ণ আসনের মধ্যে রয়েছে- ঢাকা-১, ঢাকা-৮, ঢাকা-৯, ঢাকা-১১, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৯ ও ঢাকা-২০। এছাড়া টাঙ্গাইল-১. ২ ও ৪, ফরিদপুর-৪, ফরিদপুর-৫, রাজবাড়ি-১, মাদারিপুর-১, নারায়ণগঞ্জ-৩, নরসিংদী-৪, মানিকগঞ্জ-২ ও গোপালগঞ্জ-১ আসনও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আছে। রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা এবং অতীত সংঘর্ষের ইতিহাস রাজধানী এলাকায় ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগ
ময়মনসিংহ বিভাগে ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-১০, নেত্রকোনা-৪, কিশোরগঞ্জ-৫, কিশোরগঞ্জ-৬ ও শেরপুর-৩ আসনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে প্রভাবশালী প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় কিছু ভোটকেন্দ্র বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
খুলনা বিভাগ
খুলনা বিভাগে ঝুঁকিপূর্ণ আসনের মধ্যে রয়েছে- খুলনা-২, খুলনা-৫, সাতক্ষীরা-১ ও ৩, বাগেরহাট ২, ৩ ও ৪, কুষ্টিয়া-৩, কুষ্টিয়া-৫, চুয়াডাঙ্গা-২ ও চুয়াডাঙ্গা-৩ এবং ঝিনাইদহ-১ ঝুঁকিপূর্ণ আসনের তালিকায় রয়েছে। প্রভাবশালী প্রার্থী, চরমপন্থিদের আধিপত্য ও সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এই বিভাগে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বরিশাল বিভাগ
বরিশাল বিভাগে বরিশাল-৫, পটুয়াখালী-২ ও ৩ পিরোজপুর-১ ও পিরোজপুর-২ আসন ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলীয় ও দুর্গম কয়েকটি ভোটকেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নদী ও উপকূলীয় এলাকার কারণে এখানে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সিলেট বিভাগ
সিলেট বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ আসনের মধ্যে রয়েছে- সুনামগঞ্জ-২, হবিগঞ্জ-৩, হবিগঞ্জ-৪, মৌলভীবাজার-১, সিলেট-২ ও সিলেট-৫। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি কিছু এলাকায় প্রবাসী ভোটার সংশ্লিষ্ট উত্তেজনাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগ
চট্টগ্রাম বিভাগে ঝুঁকিপূর্ণ আসনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে—কুমিল্লা-৪, কুমিল্লা-৬, কুমিল্লা-৭, কুমিল্লা-১১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ৩, ৪ ও ৫, ফেনী-২, নোয়াখালী-২, নোয়াখালী-৩, নোয়াখালী-৬, লক্ষ্মীপুর-৩ এবং চট্টগ্রাম-৩, ৫, ৬, ৯, ১২, ১৪ ও ১৫। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দুর্গম ভোটকেন্দ্র চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক আসনকে ঝঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব কারণে বাড়ছে ঝুঁকি
রাজনৈতিক গবেষক ড. শহীদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, দেশে আসন্ন নির্বাচনে ঝুঁকির প্রধান কারণগুলো হলো- তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আওয়ামী লীগ ভোট বর্জন করা, অতীতের সহিংসতার জের, সমর্থক গোষ্ঠীর সংঘর্ষ প্রবণতা, দুর্গম ও যোগাযোগ-সমস্যাপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ও স্বল্প সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ। এছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো জয়ের জন্য মরিয়া প্রবণতা সামগ্রীকভাবে নির্বাচনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। তবে বিপুল সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও ভোটারদের সচেতন অংশগ্রহণ সহিংসতামুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার মোতায়েনের পাশাপাশি মোবাইল টিম, কুইক রেসপন্স ইউনিট এবং ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আমরা শুধু জনবল বাড়াচ্ছি না, গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আশা করছি এবার একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।’
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে