স্পেনের ঝড়ের পর এবার আর্জেন্টিনার পরীক্ষা
বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনও কখনও একটি জয় শুধু তিন পয়েন্ট এনে দেয় না, বদলে দেয় পুরো টুর্নামেন্টের আবহ। প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার পর যে দলকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড় তৈরি হয়েছিল, দ্বিতীয় ম্যাচে সেই দলই আবার ফুটবলকে রঙিন করে তুলল নিজেদের ছন্দে। স্পেনের চার গোলের জয় যেন জানিয়ে দিল, বড় দলগুলোকে খুব দ্রুত বাতিলের খাতায় ফেলা যায় না। তবে বিশ্বকাপের পথ এখনও দীর্ঘ। আজ সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা। স্পেন যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তেমনি কি নিজেদের আধিপত্যের আরেকটি প্রমাণ দিতে পারবে আলবিসেলেস্তেরাও?
প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র স্পেনকে যেন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বলের দখল ছিল, সুযোগও ছিল, কিন্তু ছিল না আক্রমণের ধার। সেই অপূর্ণতার জবাব দিতে নেমেই সৌদি আরবের বিপক্ষে একেবারে বদলে যাওয়া এক স্পেনকে দেখা গেল। বলের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তারা বদলে ফেলেছিল আক্রমণের ভাষাও।
এই ম্যাচে স্পেন বুঝে গিয়েছিল, মাঝমাঠে অসংখ্য পাস খেলে লাভ নেই, প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণ ভাঙতে প্রয়োজন গতি এবং প্রস্থ। তাই আক্রমণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে দুই উইং। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল ছড়িয়ে দেওয়া, ফুলব্যাকদের ওপরে তুলে আনা এবং একের পর এক ক্রস—সব মিলিয়ে সৌদি রক্ষণকে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দেয় স্প্যানিশরা।
মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রি ছিলেন যেন একেকজন সুরকার। তারা বল ধরে রাখার চেয়ে বলের গতি বাড়াতেই বেশি মনোযোগ দেন। তাদের দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণেই প্রতিপক্ষ রক্ষণ কখনোই নিজেদের সংগঠিত করার সময় পায়নি। অন্যদিকে বাম প্রান্ত দিয়ে মার্ক কুকুরেয়ার বারবার উঠে আসা স্পেনের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
এই ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম অবশ্য লামিন ইয়ামাল। প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়েই তিনি দেখিয়ে দিলেন কেন তাঁকে ভবিষ্যতের তারকা বলা হয়। তাঁর ড্রিবল, গতি আর সাহসী সিদ্ধান্ত সৌদি ডিফেন্ডারদের বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। ইয়ামালের তৈরি করা জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে মিকেল ওইয়ারসাবাল ছিলেন অসাধারণ কার্যকর। প্রথমার্ধেই দুই গোল করে তিনি ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারণ করে দেন।
তবে এই জয় শুধু আক্রমণের নয়, মানসিকতারও। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়েরা যে আগ্রাসী কাউন্টার প্রেসিং করেছে, সেটিই ম্যাচের ছন্দ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে দেয়। সৌদি আরব দুই-তিনটি পাসও স্বস্তিতে খেলতে পারেনি। প্রতিটি বলের জন্য স্পেনের একাধিক খেলোয়াড় একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, ফলে প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস শুরু থেকেই ভেঙে যায়।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল রক্ষণভাগের শৃঙ্খলার অভাব। পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে খেললেও তাদের দুই ব্লকের মধ্যে দূরত্ব বারবার বেড়ে গেছে। ফলে মাঝের ফাঁকা জায়গায় স্পেন সহজেই বল গ্রহণ করে আক্রমণ সাজিয়েছে। প্রথম গোল দ্রুত হজম করার পর সৌদিরা নিজেদের পরিকল্পনা থেকেও সরে আসে। রক্ষণ কিছুটা ওপরে তুলে খেলতে গিয়ে পেছনে বিশাল জায়গা ফাঁকা রেখে দেয়, আর সেই সুযোগকে নির্মম দক্ষতায় কাজে লাগিয়েছে স্পেন। শেষ পর্যন্ত চার গোলের জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিয়েছে স্প্যানিশ শিবিরে। এখন শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে নিজেদের নকআউট ভাগ্য নিশ্চিত করার লড়াইয়ে অনেকটাই স্বস্তিতে থাকবে তারা।
এবার আর্জেন্টিনার সামনে ভিন্ন পরীক্ষা
আজ গ্রুপ ‘জে’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সমান আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামছে অস্ট্রিয়া। ফলে এটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, গ্রুপসেরার পথে বড় এক পরীক্ষাও।
কাগজে-কলমে ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও র্যাংকিংয়ে ২৪ নম্বরের দল অস্ট্রিয়াকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের দলটি গত কয়েক বছরে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, দ্রুত ট্রানজিশন এবং হাই প্রেসিংয়ের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। বল হারানোর পর তারা মুহূর্তেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেয়। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডাররা যদি অপ্রয়োজনীয় ভুল করেন, তাহলে সেই সুযোগ নিতে একটুও দেরি করবে না অস্ট্রিয়া।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্য তাদের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভাগের সৃজনশীলতা। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তারা প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় বলের পেছনে দৌড় করাতে সক্ষম। তবে অস্ট্রিয়া যদি মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যায়, তাহলে আলবিসেলেস্তেদের জন্য ম্যাচটি সহজ হবে না।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ম্যাচের গুরুত্ব সব সময়ই আলাদা। এই ম্যাচে জয় মানেই নকআউটের দরজা অনেকটাই খুলে যাওয়া, আর ড্র বা হার গ্রুপের শেষ ম্যাচের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তাই স্পেন যেমন নিজেদের ভুল শুধরে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে, আজ সেই একই বার্তা অনুসরণ করতে হবে আর্জেন্টিনাকেও। শুধু প্রতিভা নয়, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং নব্বই মিনিটের শৃঙ্খলাই বড় ম্যাচ জেতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
মতামত দিন