Views Bangladesh Logo

বড় শক্তি আসে, শাসক বদলায়

গণতন্ত্রের পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে আফগান উদ্বাস্তু জীবন

দিনটি ছিল ১৬ আগস্ট ২০২১। তার আগের দিন তালেবান কাবুল দখল করেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ অধ্যায় তখনও চলছে। কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেদিন যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, সেটিকে শুধু বিশৃঙ্খলা বললে সম্ভবত কম বলা হয়। সেটি ছিল একটি দেশের মানুষের হঠাৎ বুঝতে পারা—নিজের মাটিতেও আর নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা নেই।

রানওয়েতে হাজারো মানুষ। কে কোন বিমানে উঠবে, কার নাম তালিকায় আছে, বিমান কোথায় যাবে—এসব তখন গৌণ। দূরে মার্কিন বিমানবাহিনীর ধূসর সি-১৭ গ্লোবমাস্টার চলতে শুরু করতেই শত শত মানুষ তার পিছু পিছু ছুটল। কেউ বিমানের গায়ে হাত রাখলেন, কেউ ল্যান্ডিং গিয়ারে উঠে পড়ার চেষ্টা করলেন। পরে রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে মার্কিন বিমানবাহিনী জানায়, বিমানটি শত শত আফগান নাগরিক দিয়ে ঘিরে যাওয়ার পর দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে ক্রুরা কাবুল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে সেই বিমানের চাকার খোপে মানুষের দেহাবশেষও পাওয়া যায়। আকাশে ওঠার পর মানুষ পড়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীজুড়ে।

ওই দৃশ্যটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অনেক হতে পারে। কিন্তু মানবিক ব্যাখ্যা একটিই—কিছু মানুষ সেদিন মৃত্যুর সম্ভাবনা জেনেও বিমানের চাকা ধরেছিলেন, কারণ নিচে থেকে যাওয়াটাকেও তারা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংঙ্কর মনে করেছিলেন।

বিশ বছর আগে আমেরিকা আফগানিস্তানে এসেছিল যুদ্ধ, বিপুল অর্থ আর একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিশ বছর পর তারা যখন বিদায় নিল, তখন কাবুলের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর হাতে কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব ছিল না। ছিল বেঁচে থাকার তাড়া। সেই তাড়াই পরে ছড়িয়ে পড়ে আফগানিস্তানের সড়কে, সীমান্তে, তোরখাম ও চামানের পথে।

তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর বহু সাবেক সেনা, সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, নারী ও শিক্ষার্থী পাকিস্তানে পালিয়ে যান। পাকিস্তান তখন হয়ে উঠেছিল কাছের আশ্রয়। কিন্তু পাঁচ বছর পর সেই আশ্রয়ের চরিত্রও বদলে গেছে।

২০২৩ সালে পাকিস্তান ‘ইলিগ্যাল ফরেনার্স রিপ্যাট্রিয়েশন প্ল্যান’ বা অবৈধ বিদেশি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা কার্যকরভাবে শুরু করে। ইসলামাবাদের বক্তব্য, কোনো রাষ্ট্রই অনির্দিষ্টকাল অনথিভুক্ত বিদেশিদের রাখতে বাধ্য নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং তালেবান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাও যুক্ত। এই যুক্তিগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের যুক্তি যেখানে মানুষের জীবনের সঙ্গে ধাক্কা খায়, সেটিকেও আর ছোট করে দেখা ঠিক না। সম্প্রতি রেডিও ফ্রি ইউরোপ এর এক অনুসন্ধানে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বড় আকারের প্রত্যাবাসন অভিযান শুরুর পর পাকিস্তান থেকে ২৬ লাখের বেশি আফগান চাপের মুখে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই একটি সংখ্যার মধ্যে কত রকম মানুষ আছে, হিসাবের খাতায় তা দেখা যায় না। কে রাতে বাড়ির চাবি রেখে চলে গেছেন, কে সন্তানকে ঘুমন্ত অবস্থায় গাড়িতে তুলেছেন, কে তোরখাম পার হওয়ার আগে শেষবারের মতো পেছনে তাকিয়েছেন—সংখ্যা সে গল্প বলে না।

বরং আরও অস্বস্তিকর হিসাবটি অন্য জায়গায়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, মানবিক কারণে প্রায় ১৬ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ আফগানকে প্রত্যাবাসন থেকে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পাকিস্তান প্রতিনিধি কায়সার খান আফ্রিদি জানিয়েছেন, পাকিস্তানে থাকা ৭৪ হাজারের বেশি আফগান দেশে ফিরলে গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। ইউএনএইচসিআরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও প্রায় ৭৪ হাজার উচ্চঝুঁকির মানুষের কথা বলা হয়েছে। ১৬ হাজার আর ৭৪ হাজারের মাঝখানে পার্থক্যটি কাগজে ৫৮ হাজার। বাস্তবে সেখানে ৫৮ হাজার আফগানের অনিশ্চিত জীবন।

একই প্রতিবেদনে এক সাবেক আফগান সেনা কর্মকর্তার কথা আছে। গত দুই বছরে পাকিস্তানি পুলিশ তাকে দুবার ধরে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠিয়েছিল; দুবারই তিনি আবার প্রাণ নিয়ে গোপনে পাকিস্তানে ঢুকে পড়েন। এখন প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হন না। পরিচয় এড়াতে আফগান পোশাক এড়িয়ে চলেন, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না, রেস্তোরাঁয় যান না—পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়েই।

আরেক নারী অধিকারকর্মী ইসলামাবাদের বাইরে দুই ভাইকে নিয়ে থাকেন। তার কথায়, ‘অসুস্থ হলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় হয়; পরিচয় জানাজানি হলে পুলিশ পর্যন্ত খবর পৌঁছাতে পারে।’

একটি মানুষ যখন নিজের পোশাক লুকিয়ে বাঁচে, তখন নির্বাসন আর শুধু দেশ হারানোর নাম নয়। এই ভয় কল্পিত নয়, জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন—ইউনামার ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন বলেছে, আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ফেরত যাওয়া মানুষের মধ্যে নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, স্বেচ্ছাচারী আটক এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর হুমকির ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে ইউনামা ও জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর। বিশেষ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে নারী ও কিশোরী, সাবেক সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, গণমাধ্যমকর্মী এবং নাগরিক সমাজের মানুষ।

এই দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টি এখন লেখা হচ্ছে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে। আলিশবা (নিরাপত্তার কারণে বদলে দেওয়া নাম) লাহোরে ডাক্তারি পড়ছেন। ৮ সেপ্টেম্বর তিনি হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে রাতের দায়িত্বে ছিলেন। তখন ফোনে একের পর এক বার্তা আসতে শুরু করে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে, পাকিস্তানের সরকারি দপ্তর থেকে আফগান শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। পরদিন বুঝলেন, তালিকায় তার নামও আছে।

এর সূত্র ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের একটি নির্দেশ। পিএমডিসি পাকিস্তানের মেডিকেল ও ডেন্টাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফগান শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরত পাঠাতে নির্দেশ দেয় ওই নির্দেশে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ২০ আফগান শিক্ষার্থীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশে ফেরার জন্য হাজির হতে বলা হয়েছিল। তাদের চারজন নারী, সাতজন শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। দেশজুড়ে দুই শতাধিক আফগান মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী এই নির্দেশে আক্রান্ত হতে পারেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

চব্বিশ ঘণ্টা একটি ব্যাগ গোছানোর জন্য যথেষ্ট। জামা নেওয়া যায়, পাসপোর্ট রাখা যায়, প্রয়োজনীয় কাগজ আলাদা করা যায়। কিন্তু চার বছরের চিকিৎসাশিক্ষা কোন ব্যাগে রাখা যায়? রাতের ওয়ার্ড, পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রথম রোগী দেখা, প্রথমবার স্টেথোস্কোপ হাতে নেওয়া—এসব তো সীমান্তে জমা দেওয়ার মালপত্র নয়।

আলিশবার কাহিনিটি আরও জটিল, কারণ তিনি পাকিস্তানে অবৈধভাবে পড়তে আসেননি। আল-জাজিরার অনুসন্ধান বলছে, তার মতো অনেকেই পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন পরিচালিত আল্লামা ইকবাল বৃত্তির মাধ্যমে এসেছেন। ভিসা হয়েছে, ভর্তি হয়েছে, সরকার-সমর্থিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই বছরের পর বছর পড়েছেন।

শেষ পর্যন্ত ১৩ আফগান মেডিকেল শিক্ষার্থী লাহোর হাইকোর্টে যান। তাদের সাতজন নারী। ১১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি খালিদ ইসহাক পিএমডিসির নির্দেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। পাকিস্তানের ‘ডন’ জানিয়েছে, আদালত পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে।

তাঁরা আপাতত পড়তে পারবেন। এই ‘আপাতত’ শব্দটিই এখন পাকিস্তানে থাকা বহু আফগানের জীবন। আপাতত পুলিশ আসেনি। আপাতত ভিসা চলছে। আপাতত ক্লাসে যাওয়া যাবে। আপাতত সীমান্তে পাঠানো হবে না। কিন্তু মানুষ তো ‘আপাতত’ দিয়ে ভবিষ্যৎ বানায় না।

নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও দুর্দশার। ইউনেস্কোর আগস্ট ২০২৬-এর তথ্য বলছে, আফগানিস্তান এখন পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েদের ও নারীদের প্রাথমিক স্তরের পর উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ নিষিদ্ধ; প্রায় ২৪ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ২০২২ সাল থেকেই বন্ধ। অর্থাৎ একজন আফগান পুরুষ শিক্ষার্থী ফিরে গিয়ে কোনো না কোনো শিক্ষাপথ খুঁজে পেতে পারেন। একজন নারী শিক্ষার্থীর কাছে ‘ফিরে যাওয়া’ মানে হয়তো তার উচ্চ শিক্ষার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া।

আলিশবা আল-জাজিরাকে বলেছেন, তার মা মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে দেখার স্বপ্নে গ্র্যাজুয়েশনের পোশাকও তৈরি করে রেখেছেন। এখন মেয়েটির ঘরের কোণে একটি জরুরি ব্যাগ—কাগজপত্র আর বদলানোর কাপড়। অন্যদিকে মায়ের আলমারিতে সেই গ্র্যাজুয়েশন পোশাক। এই দুই ব্যাগের মাঝখানেই যেন পুরো আফগান সংকটটি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে এমন জন্মভূমি, যেখানে ফিরে যাওয়ার ভয়। অন্যদিকে এমন আশ্রয়ের দেশ, যেখানে থাকার নিশ্চয়তা নেই।

পাকিস্তানের নিরাপত্তার অধিকার আছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি শুধু মানুষকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতায় মাপা যায় না। যে মানুষ ফিরলে নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়বেন, যে নারী ফিরলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবেন না, যে শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্র নিজেই বৃত্তি দিয়ে এনে চার বছর পড়িয়েছে—তাদের আলাদা করে দেখার ক্ষমতাও রাষ্ট্রের শক্তির অংশ। কারণ আইন সবার জন্য এক হতে পারে; মানুষের বিপদ সব সময় এক নয়। মানচিত্রে আফগানিস্তান আছে। পাকিস্তানও আছে। মাঝখানে দীর্ঘ সীমান্ত, কাঁটাতার, চৌকি, পতাকা—সব আছে। শুধু এই মানুষগুলোর জীবনে একটি নিশ্চিন্ত ঠিকানা নেই। আর যদিও বা ফেরে, সেখানে ফিরে মানুষের মতো বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাটি আর নেই।

পাকিস্তানে উদ্বাস্তু আফগানিদের এই কাহিনীগুলো এখন শুধু আফগানদের দুঃখের কাহিনী নয়। এটি আমাদের সময়ের এক ভয়ংঙ্কর ভূরাজনীতির প্রতিচ্ছবি। আমেরিকার প্রত্যক্ষ যুদ্ধ, তার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট, কিংবা তার ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ছায়া পেরিয়ে পৃথিবীর বহু দেশ আজ এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে—মানচিত্রে রাষ্ট্র আছে, পতাকা আছে, রাজধানী আছে; কিন্তু লাখো মানুষের জীবনে দেশ বলে আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। কাবুল থেকে বাগদাদ, মধ্যপ্রাচ্যের বহু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আফ্রিকার অস্থির ভূগোল—যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা এসেছে বহুবার, সৈন্য ফিরেছে, সামরিক ঘাঁটি গুটিয়েছে, রাষ্ট্রনেতারা বিজয়ের ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধ যে-দিন শেষ হয়, উদ্বাস্তু মানুষের যুদ্ধ সেদিন থেকে শুরু হয়েছে। আর পৃথিবীর সব উদ্বাস্তুদের যুদ্ধ একটি। একটি আশ্রয়ের ঘর খোঁজার। একটি বৈধ কাগজের। সন্তানের স্কুলের। হাসপাতালের বিছানার। এমন একটি রাতের, যে রাতে দরজায় শব্দ হলেই বুক কেঁপে উঠবে না।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ