Views Bangladesh Logo

উত্তাল বিশ্ব, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একটি রোমাঞ্চকর খেলা: বিশ্বকাপের শুরুটা যেভাবে

বিশ্বকাপ ফুটবল— “দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ”। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। কিন্তু প্রায় একশ বছর আগে, এই টুর্নামেন্টের অস্তিত্বই ছিল না। সেকালে ফুটবলে বিশ্বসেরা নির্ধারণের একমাত্র মঞ্চ ছিল অলিম্পিক গেমস। এই খেলাটির প্রতি সারাবিশ্বের মানুষের ব্যাপক সাড়া দেখে ফিফা'র তৎকালীন এবং প্রথম প্রেসিডেন্ট জুলে রিমের (Jules Rimet) মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল; ‘ফুটবলের জনপ্রিয়তা যদি এতই বেশি, তাহলে এর নিজের আলাদা বিশ্বমঞ্চ থাকবে না কেন?’ সেই ভাবনা থেকেই শুরু। ১৯২৮ সালে ফিফা সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতি চার বছর পর পর আয়োজন করা হবে একেবারে নতুন এক টুর্নামেন্ট; শুধু ফুটবলের জন্য, ফুটবল ভক্তদের জন্য এবং শুধু ফুটবল খেলা জাতীয় দলগুলোর জন্য। তখনও কেউ জানত না, ফুটবল একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হবে।

সময়টা ১৯৩০। বিশ্ব তখন মহামন্দার ধাক্কায় কাঁপছে। ইউরোপের অর্থনীতি বিপর্যস্ত, অনেক দেশেই চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইউরোপিয়ান দেশগুলো তো বটেই, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সমুদ্রযাত্রা করে ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলবে এমন আগ্রহ ছিল না বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই। অনেকেই ভেবেছিল, এই টুর্নামেন্ট হয়তো শুরুর আগেই ভেস্তে যাবে। কিন্তু অলিম্পিক ফুটবলের দুইবারের চ্যাম্পিয়ন, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একেবারে ভিন্ন কথা বলল। তারা ঘোষণা দিল— খেলা হবেই! উরুগুয়ে তাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চেয়েছিল। শুধু আয়োজনই না, অংশ নিতে আসা দলগুলোর যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচও বহন করতে রাজি ছিল তারা।


নানাবিধ জটিলতা পেরিয়ে সেই বছর উরুগুয়েতে বসেছিল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ। ফিফা নিজে সব খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাত্র গুটিকয়েক ইউরোপীয় দলকে রাজি করাতে পারল বিশ্বকাপের জন্য। ইউরোপ থেকে শেষ পর্যন্ত সাহস করে আসে মাত্র চারটি দেশ; ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। সমুদ্রপথে প্রায় দুই সপ্তাহ জাহাজে ভেসে তারা পৌঁছায় মন্টেভিডিওতে। কল্পনা করুন— আজকের মতো চার্টার ফ্লাইট নয়, বিশ্বকাপ খেলতে জাহাজে করে যাত্রা! বাকি নয়টি দল এলো আমেরিকা মহাদেশ থেকে। মোট ১৩টি দল নিয়ে শুরু হলো ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ।


দর্শকপ্রিয়তা ছাড়াল সব কল্পনা
প্রথম আসরেই বাজিমাত! দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি বিশ্বকাপের আমেজে প্রাণ সঞ্চার করে। টুর্নামেন্ট যত এগোয়, উত্তেজনাও বাড়ে। চার গ্রুপে বিভক্ত ১৩টি দল, প্রতি গ্রুপের সেরা দল সরাসরি যাবে সেমিফাইনালে।


আর্জেন্টিনা পড়ল গ্রুপ ১-এ। ফ্রান্সকে ১–০, মেক্সিকোকে ৬–৩ আর চিলিকে ৩–১ এ উড়িয়ে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলো। স্বাগতিক উরুগুয়ে গ্রুপ ৩-এ পেরুকে ১–০ আর রোমানিয়াকে ৪–০ তে হারিয়ে ওঠে সেমিফাইনালে। সেখানে যুগোস্লাভিয়াকে ৬–১ এ উড়িয়ে ফাইনালে পা রাখল তারা। অপর সেমিফাইনালের স্কোরও কাকতালীয়ভাবে হুবহু এক! সেমিফাইনালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৬–১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।


ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী; উরুগুয়ে বনাম আর্জেন্টিনা। ১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই, মন্টেভিডিওর এস্তাদিও সেন্টেনারিওতে সেই খেলা দেখতে জড়ো হয় ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সরকারি হিসাব আর সংবাদপত্রের বর্ণনায় দর্শকসংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য থাকলেও, স্টেডিয়ামের বাইরে-ভেতরে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে ধারণা করা হয়। অনেকে ভোর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছিল, কারণ ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে দেখার সুযোগ তো আর রোজ আসে না।



বল বিভ্রাট
ফাইনাল ম্যাচে একটি মজার ঘটনা ঘটে যা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। তখনকার দিনে ফিফার অফিশিয়াল কোন বল ছিল না, বলের নির্দিষ্ট মাপ বা ওজনের কোনো বাধ্যবাধকতাও ছিল না। টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া দলগুলো নিজেদের সঙ্গে বল নিয়ে আসত এবং যেটায় সম্মতি মিলত সেটা দিয়েই খেলা হত। ওই ম্যাচ আর্জেন্টিনা তাদের বল দিয়ে খেলতে চায়, অপরদিকে উরুগুয়েও চায় নিজেদের বল দিয়ে ফাইনাল খেলতে। শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত এক সিদ্ধান্তে সমাধান হয় এই জটিলতার; প্রথমার্ধ খেলা হবে আর্জেন্টিনার বলে, দ্বিতীয়ার্ধ উরুগুয়ের বলে। এমন ঘটনা আজ ভাবাই যায় না। বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস মাঠে ঢুকলেন দুই বাহুর নিচে দুটি বল নিয়ে। তাঁর নিজের স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছিলেন: "দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা স্পষ্ট হয়ে পড়ল যখন বল বেছে নেওয়ার সময় এলো। দুই দলই নিজেদের সাথে বল নিয়ে এসেছিল এবং সেটা দিয়েই খেলার দাবি করছিল।"


আর্জেন্টিনার আনা বলের নাম ‘টিয়েন্টো’ (Tiento) , স্পেনীয়তে যার অর্থ "স্পর্শ" বা "ছোঁয়া"। বলটি ১২টি আয়তাকার চামড়ার প্যানেলে তৈরি, লেস দিয়ে বাঁধা, আকারে ছোট ও হালকা। এটি স্কটল্যান্ডে তৈরি "Players" ব্র্যান্ডের বল। উরুগুয়ের বলের নাম ‘টি-মডেল’ (T-Model) , যাকে ‘ওয়েম্বলি’ ও বলা হতো। নামটি এসেছে এর বিশেষ গঠন থেকে; ১১টি T-আকৃতির চামড়ার ফালি পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে তৈরি বলটি ছিল আর্জেন্টিনার বলের তুলনায় ভারী ও বড়। এবারে ঝামেলা বাধলো কোন অর্ধে কোন বল দিয়ে খেলা হবে এই নিয়ে। রেফারি ল্যাঙ্গেনাস মুদ্রা উল্টালেন, টসে নির্ধারিত হল; প্রথমার্ধ খেলা হবে আর্জেন্টিনার বলে, দ্বিতীয়ার্ধ উরুগুয়ের বলে। পরে অবশ্য জানা যায় যে স্বাগতিক উরুগুয়ে আর্জেন্টিনার অনুরোধে প্রথমার্ধ টিয়েন্টো বলে খেলতে রাজি হয়।

'আ টেল অব টু হাফ্‌স'
৩০ জুলাই,১৯৩০। দর্শকদের চাপে সকাল আটটায় মন্টেভিডিওর এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামের গেট খুলে দেওয়া হয়েছিল— ম্যাচের ছয় ঘণ্টা আগে। দুপুরের মধ্যেই গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ! ইতিহাসবিদদের মতে দর্শকসংখ্যা ছিল ৯৩,০০০-এর কাছাকাছি। মাঠের চারদিকে রাইফেল আর বেয়নেট হাতে সশস্ত্র প্রহরী। উত্তেজনা তখন তুঙ্গে!

আর্জেন্টিনার হালকা টিয়েন্টো বলে শুরু হলো প্রথমার্ধ। ১২ মিনিটে পাবলো দোরাদো গোল করে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন। ২০ মিনিটে কার্লোস পিউকেল্লে সমতায় ফেরান আর্জেন্টিনাকে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা গুইলারমো স্টেবিলে ৩৭ মিনিটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২–১ এ এগিয়ে দেন। এক গোলে এগিয়ে থেকে আর্জেন্টিনা বিরতিতে যায়। মনে হচ্ছিল প্রথম বিশ্বকাপ হয়তো তাদের হাতেই উঠবে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে যেন ঝড় তোলে। গ্যালারির গর্জন, দর্শকদের উন্মাদনা আর একের পর এক আক্রমণে তারা ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে এলো উরুগুয়ের ভারী টি-মডেল, ম্যাচের চিত্র যেন মুহূর্তেই বদলে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে পাল্টা আক্রমণে ফিরে তিনটি গোল করে ম্যাচ জিতে নেয়। ৫৭ মিনিটে পেদ্রো কিয়া সমতা ফেরান, ৬৮ মিনিটে সান্তোস ইরিয়ার্তে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন, আর ৮৯ মিনিটে হেক্টর ক্যাস্ট্রো চূড়ান্ত গোল করে ৪–২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। উরুগুয়ে হলো ইতিহাসের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!



পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনা সমর্থকরা দুষলেন উরুগুয়ের ভারী বলটিকে। বলের ভার কি আসলেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল? সেই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। তবে ফলাফল চিরকালের জন্য লেখা হয়ে গেল। পরদিন উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি ঘোষণা হলো। জুলে রিমে নিজে ট্রফি তুলে দিলেন বিজয়ী দলের হাতে। সেই ট্রফি পরে তাঁর নামেই ‘জুলে রিমে ট্রফি’ হিসেবে নামকরণ করা হয়।

অনেক ইতিহাসবিদ আবার প্রশ্ন তুলেছেন, সেদিন সত্যিই কি দুটি বল ব্যবহার হয়েছিল? রেফারি ল্যাঙ্গেনাস নিজে তাঁর স্মৃতিকথায় বলের পরিবর্তনের কথা কোথাও উল্লেখ করেননি। উরুগুয়ে বা আর্জেন্টিনার সমসাময়িক কোনো সংবাদমাধ্যমেও দ্বিতীয়ার্ধে বল বদলের বিবরণ নেই। তবে একটি টি-মডেল বল আজও সংরক্ষিত আছে ম্যানচেস্টারের ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামে। আরেকটি ভার্সন ২০০৪ সালে জার্মানিতে নিলামে ৫০,০০০ ইউরোতে বিক্রি হয়ে স্পেনের ফুটবল মিউজিয়ামে ঠাঁই পেয়েছে। সেই ম্যাচ থেকেই ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবাদের জন্ম হয়; "A tale of two halves" - দুটি বল, দুটি অর্ধ, দুটি ভাগ্য।

সেদিন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, এই ছোট্ট আয়োজনই একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হবে। ১৩ দল নিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ ৪৮ দলের মহাযজ্ঞে রূপ নিয়েছে। যে টুর্নামেন্ট একসময় আয়োজন করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিল, সেটাই এখন পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে শ্বাসরুদ্ধ করে রাখে।

১৯৩০ সালের সেই দিনগুলো আজ কিংবদন্তির মতো। বল নিয়ে বাকবিতণ্ডা, মাঠে সশস্ত্র প্রহরী, স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ— এই দৃশ্যগুলো অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব ইতিহাস। বিশ্বকাপ আজ বৈশ্বিক উৎসব, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন। ফুটবলের জাদু শতাব্দী পেরিয়েও থামেনি, বরং সময়ের স্রোতে আরও প্রসার লাভ করেছে। আর কিছুদিন পর, প্রথম আসরের প্রায় একশ বছর পর, বিশ্বকাপ আবার ফিরছে। উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এবারের আসরের আয়োজক। কে জানে, ইতিহাসের পাতায় এবার হয়তো যুক্ত হবে আরেকটি রূপকথা যার শুরু সেই ১৯৩০ সালে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ