সমুদ্র-পাহাড়-বনের দেশ, পর্যটনের পথে কেন এত কাঁটা
বাংলাদেশ যেন প্রকৃতির হাতে লেখা এক অসমাপ্ত কবিতা। কোথাও বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, কোথাও মেঘের গায়ে মাথা ঠেকানো পাহাড়। কোথাও সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে বাঘের পায়ের ছাপ, কোথাও হাওরের জলে আকাশের নীল। চায়ের সবুজ গালিচা, নদীর বুকে নৌকার পাল, প্রাচীন স্থাপত্য, লোকসংস্কৃতি আর রসনার বৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে একটি দেশের ভেতরেই যেন বহু বাংলাদেশের বসতি।
তবু সেই বাংলাদেশের গল্প আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে এখনো যথেষ্ট জোরে শোনা যায় না। পরিসংখ্যানও সেই নীরবতারই সাক্ষী। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে এসেছেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন বিদেশি দর্শনার্থী। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪, আর ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১। এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি দর্শনার্থী কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে ভারতের দর্শনার্থী কমেছে ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। তবে এ সংখ্যার সবাই অবকাশযাপনের পর্যটক নন; ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির বিদেশি দর্শনার্থীও এর মধ্যে রয়েছেন।
অবশ্য বাংলাদেশের পর্যটনের গল্প শুধু বিদেশিদের দিয়ে লেখা নয়। ঈদের ছুটি, শীতের সকাল কিংবা দীর্ঘ ছুটিতে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিনের নীল জল, সাজেকের মেঘ, বান্দরবানের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান কিংবা সুন্দরবনের পথে নামে মানুষের ঢল। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন ইতোমধ্যেই বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সেই স্রোতকে পরিকল্পিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্পে রূপ দেওয়ার জায়গাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল এজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু রিডিজাইন ট্যুরিজম’। বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বুকিং, ভার্চুয়াল ট্যুর ও স্মার্ট পর্যটনের দিকে ছুটছে, বাংলাদেশ তখনও তার প্রকৃতির দরজা পুরোপুরি খুলে দিতে পারেনি।
এত সৌন্দর্যের দেশ হয়েও কেন পিছিয়ে?
প্রথমত, পরিকল্পনার দীর্ঘসূত্রতা। পর্যটনের মহাপরিকল্পনা যেন বছরের পর বছর কাগজের পাতায় পথ হাঁটছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া সেই পরিকল্পনা নানা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকার পর এখন আবার চূড়ান্ত করার উদ্যোগ চলছে। পরিকল্পনায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন সম্পদ চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০৪১ সালের মধ্যে বছরে ৫৫ দশমিক ৭ লাখ বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যও রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংকট গন্তব্যের অভাবে নয়; সংকট হলো—গন্তব্যকে পরিকল্পিত পর্যটনপণ্যে পরিণত করার সমন্বিত ব্যবস্থার অভাব।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বকে বাংলাদেশ চেনানোর প্রচার দুর্বল। আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে একটি দেশের পরিচিতি তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন দরকার। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ও প্রচারের বরাদ্দ ছিল মাত্র ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বোর্ডে স্থায়ী কর্মীও ছিলেন মাত্র ৪৩ জন, সঙ্গে ৯ জন আউটসোর্সিং কর্মী।
সুন্দরবনের বাঘ, কক্সবাজারের সূর্যাস্ত, পাহাড়ের মেঘ কিংবা সিলেটের চা-বাগান—দেশের মানুষের কাছে পরিচিত এই দৃশ্যগুলো তাই বিশ্ব পর্যটকের চোখে এখনো অনেকটাই অচেনা।
তৃতীয়ত, সৌন্দর্যের সঙ্গে তাল মেলেনি অবকাঠামো। একটি জায়গা সুন্দর হলেই পর্যটনকেন্দ্র হয় না। সেখানে যেতে হয় সহজে, থাকতে হয় নিরাপদে, খেতে হয় স্বস্তিতে, ঘুরতে হয় নিশ্চিন্তে। প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা, মানসম্মত আবাসন, দক্ষ গাইড, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ও জরুরি চিকিৎসা।
বাংলাদেশের বহু সম্ভাবনাময় গন্তব্যে এই সমন্বিত সুবিধার ঘাটতি এখনো প্রকট। ফলে প্রকৃতি হাতছানি দিলেও পর্যটকের পথ অনেক সময় থেমে যায় ব্যবস্থাপনার দেয়ালে।
চতুর্থত, পর্যটকের সংখ্যা নয়, মানও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি দর্শনার্থী এলেই পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হয় না। তিনি কতদিন থাকলেন, কোথায় থাকলেন, কী খেলেন, কী কিনলেন, স্থানীয় পরিবহন ও গাইড ব্যবহার করলেন কি না—এসবের ওপরও নির্ভর করে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল।
সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘আরও পর্যটক’ নয়; বরং এমন পর্যটনব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একজন পর্যটক দেশে এসে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কারুশিল্প ও সেবাখাতে অর্থ ব্যয় করবেন। তবেই পর্যটনের ঢেউ পৌঁছাবে স্থানীয় মানুষের ঘরেও।
পঞ্চমত, পর্যটনের চাপে প্রকৃতিই যেন বিপন্ন না হয়। বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি; অথচ অপরিকল্পিত পর্যটনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও প্রকৃতি।
সেন্টমার্টিন তার সতর্ক ঘণ্টা। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বীপটির উন্নয়নকৃত এলাকা ২ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে। একই গবেষণায় ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রবালপ্রাচীরের অবক্ষয় প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা অপরিকল্পিত পর্যটন ও উন্নয়নকে দ্বীপটির পরিবেশগত ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
অর্থাৎ পর্যটক বাড়াতে গিয়ে যদি সমুদ্র, পাহাড়, বন আর প্রবালই হারিয়ে যায়, তাহলে একদিন পর্যটকের জন্য গন্তব্যটিই থাকবে না।
তবু সম্ভাবনার জানালা বন্ধ হয়নি। সরকার এখন ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে ঘিরে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। ইকো-ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই পথ দুটি- প্রকৃতিকে শুধু প্রদর্শনের বস্তু বানানো, অথবা প্রকৃতিকে বাঁচিয়েই পর্যটনের নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলা।
ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই পথকে আরও সহজ করতে পারে। এক প্ল্যাটফর্মে গন্তব্য, যাতায়াত, হোটেল, গাইড, টিকিট, নিরাপত্তা ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা—সবকিছু যদি হাতের মুঠোয় আসে, তবে অচেনা বাংলাদেশও হয়ে উঠতে পারে সহজলভ্য। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পর্যটনের সংকট সৌন্দর্যের নয়; সৌন্দর্যকে সঠিকভাবে তুলে ধরা, সংরক্ষণ করা এবং অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থার। সমুদ্র আছে, কিন্তু পথের কাঁটা আছে। পাহাড় আছে, কিন্তু অবকাঠামোর ঘাটতি আছে। বন আছে, কিন্তু সংরক্ষণের প্রশ্ন আছে। ইতিহাস আছে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে গল্প বলার আয়োজন কম।
তাই বিশ্ব পর্যটন দিবসে প্রশ্নটি শুধু—বাংলাদেশে কত সৌন্দর্য আছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—প্রকৃতি যে দরজা খুলে রেখেছে, আমরা কি সেই দরজায় পৌঁছানোর পথটি তৈরি করতে পারছি?
মতামত দিন