Views Bangladesh Logo

যুদ্ধের পৃথিবীতে জেগে উঠছে মধ্য এশিয়া

বাংলাদেশের সামনে ভূগোলের নতুন পাঠ

পৃথিবী এখন বড়ই অস্থির। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, শক্তির নতুন বিন্যাস, পুরোনো মানচিত্রে নতুন করে ঘষামাজা। মানচিত্রেরও একটি নীরব ভাষা আছে। শান্তির সময়ে যে মরুভূমি, পাহাড় কিংবা স্থলবেষ্টিত অঞ্চলকে নিছক কয়েকটি রঙের খোপ বলে মনে হয়, যুদ্ধ শুরু হলেই তার দাম নতুন করে নির্ধারিত হয়। তখন একটি বন্দর আর শুধু বন্দর থাকে না, রেললাইন হয়ে ওঠে কৌশলগত সম্পদ, একটি প্রণালি হয়ে ওঠে বিশ্বের জ্বালানি-শিরা, আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র কখনো বাজার, কখনো করিডর, কখনো নিরাপত্তার ঢাল।

২০২৬ সালের পৃথিবী সেই নতুন হিসাবের মধ্যেই দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্ত বদলায় না; বদলে দেয় বন্দর, রেলপথ, জ্বালানির দাম, বাজারের গতিপথ এবং বন্ধুত্বের মূল্যও। হরমুজে কয়েকটি জাহাজের গতি থমকে গেলে তার কম্পন এসে লাগে ঢাকার বিদ্যুৎ বিলেও। ইউক্রেনের দীর্ঘ যুদ্ধ রাশিয়ার পুরোনো প্রভাববলয়ের ভিত নড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণ দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত ছায়া ফেলে। আর ঠিক এই অস্থিরতার মাঝখানে বহুদিনের তুলনামূলক নীরব মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ—কাজাখিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান—নিজেদের মানচিত্র যেন নতুন চোখে পড়তে শুরু করেছে। চারপাশে তাদের বড় বড় শক্তি। উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে চীন, দক্ষিণে ইরান ও আফগানিস্তান, আরও নিচে ভারত ও পাকিস্তান, পশ্চিমে কাস্পিয়ান পেরিয়ে ইউরোপ। একসময় এই ভূগোলকেই তাদের দুর্বলতা বলা হতো। সমুদ্র নেই, পথ সীমিত, বড় শক্তির মাঝখানে অবস্থান—সব মিলিয়ে যেন অন্যের কৌশলের জমি। এখন সেই একই ভূগোলকে তারা সম্পদে পরিণত করতে চাইছে। কেউ চীনের সঙ্গে রাস্তা ও রেল বানাচ্ছে, কেউ রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক ধরে রাখছে, কেউ ইরানের পথ ধরে সমুদ্রে নামতে চাইছে, কেউ ভারতের সঙ্গে ইউরেনিয়াম, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার নতুন খাতা খুলছে। তাদের নতুন উপলব্ধি খুব সরল—একটি মাত্র বড় শক্তির ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিরাপদ থাকা যায় না; দরজা যত বেশি, অন্ধকারের ভয় তত কম।

মধ্য এশিয়ার এই পরিবর্তনের আসল গুরুত্ব এখানেই। পাঁচ দেশ কোনো নতুন সামরিক বলয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে না, বরং একসঙ্গে কয়েকটি দরজা খুলছে। রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক রাখছে, চীনের বিনিয়োগ নিচ্ছে, ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, ইরানের পরিবহনপথ ব্যবহার করতে চাইছে, আবার ভারতের সঙ্গে খনিজ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ তারা আর কেবল বড় শক্তির প্রভাবক্ষেত্র হয়ে থাকতে রাজি নয়; বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকেই নিজেদের দর-কষাকষির শক্তিতে রূপ দিতে চাইছে।

একসময় মধ্য এশিয়াকে প্রায় অবলীলায় বলা হতো ‘রাশিয়ার উঠোন’। সেই পরিচয় পুরোপুরি মুছে যায়নি। সোভিয়েত উত্তরাধিকার হিসেবে ভাষা, শ্রমবাজার, নিরাপত্তা, রেল যোগাযোগ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় মস্কোর প্রভাব এখনও গভীরভাবে অটুট। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত মনোযোগে দীর্ঘ চাপ তৈরি করেছে। মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো তাই বুঝেছে—মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন, কিন্তু মস্কোই যদি একমাত্র ভরসা হয়, তবে সেটিই একদিন দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে। এই ফাঁকেই চীন বহু আগেই ঢুকে পড়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, পাইপলাইন ও খনি প্রকল্পে বেইজিং বিপুল বিনিয়োগ করেছে। মধ্য এশিয়া চীনের কাছে শুধু প্রতিবেশী নয়; ইউরোপ, রাশিয়া, ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার দিকে একটি বিশাল স্থলসেতু। তার ওপর অঞ্চলটির ইউরেনিয়াম, গ্যাস, তামা, সোনা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ চীনের শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু এখানেও পাঁচ রাষ্ট্র এখন সাবধানী। চীনকে প্রয়োজন, তবে একমাত্র চীন নয়।
সে কারণেই ইউরোপ এসেছে খনিজ, জ্বালানি, পরিবহন ও বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের হিসাব নিয়ে। যে অঞ্চলে একসময় মস্কোর দরজাই প্রধান ছিল, সেখানে এখন বেইজিং, ব্রাসেলস, আঙ্কারা, তেহরান ও দিল্লিও নিজস্ব দরজা খুলছে।

ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ পুরোনো হলেও বাস্তব সমস্যা ছিল ভূগোল। পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি স্থলপথে মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানো ভারতের পক্ষে সহজ নয়। সে কারণে ইরানের চাবাহার বন্দর দিল্লির কাছে কেবল একটি বন্দর নয়; এটি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে একটি বিকল্প প্রবেশদ্বার। ভারত এই প্রবেশদ্বাটি ব্যবহার করে মধ্য এশিয়ার এই ৫ দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক আদান প্রদানে যুক্ত হতে চলছে। উজবেকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নয়ন সেই বড় কৌশলের অংশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২৯ আগস্টের তাসখন্দ সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই সফরে ভারত ও উজবেকিস্তান তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ থেকে ‘সার্বিক কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করেছে। পাশাপাশি দুই দেশ ১১টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দিতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক উদ্যোগের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নিয়েছে। কাজেই বাণিজ্য কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধান, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ভারত এখন মধ্য এশিয়ায় কেবল কূটনৈতিক উপস্থিতি নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানও তৈরি করতে চাইছে। ভারত বুঝেছে, মধ্য এশিয়ায় উপস্থিতি মানে শুধু কূটনৈতিক পতাকা ওড়ানো নয়; ভবিষ্যতের জ্বালানি, সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি এবং যোগাযোগের পথেও জায়গা করে নেওয়া। তবে এটিকে চীন বা রাশিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার ভারতীয় অভিযান হিসেবে দেখা ভুল হবে। মধ্য এশিয়ায় মস্কো ও বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব এখনও ভারতের তুলনায় বহু গুণ বড়।

তাদের নিজেদের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্তবিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ, উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্কোন্নয়ন এবং পারস্পরিক বাণিজ্যের বৃদ্ধি দেখাচ্ছে—তারা একটি সহজ সত্য বুঝেছে। বাইরের শক্তির সঙ্গে ভালো দর-কষাকষি করতে হলে আগে নিজের পাড়াটিকে শান্ত করতে হয়। সীমান্তে যদি সারাক্ষণ বারুদের গন্ধ থাকে, সেখানে বাণিজ্যের ট্রাক চলে না।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই শিক্ষাটি খানিক অস্বস্তিকর। আমাদের অঞ্চলে সীমান্ত, ট্রানজিট, পানি, বন্দর ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস এখনও বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে। মধ্য এশিয়া অন্তত উল্টো পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। পুরোনো বিরোধ তাদেরও আছে, কিন্তু সীমান্তকে শুধু সার্বভৌমত্বের বেড়া নয়, পণ্য ও মানুষের চলাচলের পথ হিসেবেও তারা দেখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বিষয়টি বিশেষ অর্থবহ। বাংলাদেশ মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশী নয়, কিন্তু এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত আমাদের দরজায় এসে পড়ে তিন জায়গায়—জ্বালানি, বাণিজ্য এবং পররাষ্ট্রনীতিতে। প্রথমত, আমাদের আমদানি করা জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লেই জাহাজভাড়া, বীমা, পরিবহন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। দূরের যুদ্ধ তখন ঢাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, শিল্প এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয় শিক্ষা যোগাযোগ ও বাণিজ্যে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের মুখে বসে আছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আছে। পাশে ভারত, কাছেই চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজার, সামনে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ। এই ভূগোল অনেক স্থলবেষ্টিত দেশের কাছে স্বপ্ন। কিন্তু ভূগোল নিজে থেকে আয় করে না। তাকে রেল, সড়ক, বন্দর, শুল্কব্যবস্থা, আঞ্চলিক সংযোগ ও স্থির ও দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হয়। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সমুদ্রহীন হয়েও রেলকে সমুদ্রের বিকল্প বানাতে চাইছে; বাংলাদেশ সমুদ্রের সামনে বসে থেকেও যদি সংযোগের সুযোগ হারায়, সেটি ভূগোলের ব্যর্থতা নয়—নীতির।

তৃতীয় শিক্ষা পররাষ্ট্রনীতিতে। বাংলাদেশ বহুদিন ধরে বলে এসেছে—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ নীতিটি এখনও মূল্যবান। তবে আজকের পৃথিবীতে এর সঙ্গে আরেকটি শব্দ জরুরি—বিকল্প। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জ্বালানি ও শ্রমবাজারের যোগ থাকবে। কিন্তু কোনো একটি শক্তি, একটি বাজার কিংবা একটি সরবরাহপথ যেন এমনভাবে অপরিহার্য হয়ে না ওঠে, যাতে সংকটের দিনে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটিই ছোট হয়ে যায়। মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ আজ মূলত এই কাজটিই করছে। তারা রাশিয়াকে ত্যাগ করছে না, চীনকে ঠেকাচ্ছে না, ভারতকেও দূরে রাখছে না। বরং অংশীদার বাড়িয়ে বিকল্প বাড়াচ্ছে; আর বিকল্প বাড়িয়ে নিজেদের দর-কষাকষির শক্তি বাড়াচ্ছে।

এই কারণেই মধ্য এশিয়ার জেগে ওঠা বাংলাদেশের কাছে দূরের পাঁচটি দেশের কূটনৈতিক গল্প নয়; এটি আমাদের নিজের মানচিত্রের সামনে দাঁড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধের পৃথিবীতে শক্তি শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে মাপা হয় না। বন্দর, রেলপথ, জ্বালানির উৎস, বাজার, সরবরাহপথ এবং কূটনৈতিক বিকল্পও শক্তি।


কাজাখিস্তান, উজবেকিস্তান কিংবা তুর্কমেনিস্তানের হাতে সমুদ্র নেই, তবু তারা সীমাবদ্ধ ভূগোলকে দর-কষাকষির সম্পদে পরিণত করছে। বাংলাদেশের হাতে আছে বঙ্গোপসাগর। আছে বন্দর, বাজার, অবস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগের অসাধারণ সম্ভাবনা। প্রয়োজন শুধু এই ভূগোলকে অন্যের কৌশলের জমি না বানিয়ে বাংলাদেশের নিজের কৌশলগত সম্পদে পরিণত করা। মধ্য এশিয়া নিজের মানচিত্রের দাম বুঝতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এখনই এই হিসাবের খাতা খোলার সময়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ