Views Bangladesh Logo

২৭ বছর জমি নদীর তলায়, ৩৮ বছর মামলা আদালতপাড়ায়

একসময় সেখানে ছিল জমি। ছিল মাটির গন্ধ, ফসলের স্বপ্ন, সীমানার আল, দখল ও মালিকানার দাবি। ছিল ভবিষ্যতের হিসাবও। প্রতি শতাংশ জমির দাম ছিল আনুমানিক দুই হাজার টাকা। আট শতাংশ জমির মোট মূল্য ছিল ১৬ হাজার টাকা। আজ সেই জমি নেই। নেই মাটির ওপর কোনো চিহ্ন, নেই সীমানা, নেই দখলের দৃশ্যমান অস্তিত্ব। ১৯৯৯ সালে মেঘনা নদীর শাখা লতা নদীর ভাঙনে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বিদ্যানন্দপুর ইউনিয়নের রতনপুর মৌজার সেই আট শতাংশ জমি চলে গেছে নদীগর্ভে।

কিন্তু জমি হারালেও হারায়নি তার মালিকানার দাবি। আর সেই দাবিকে ঘিরে চলা মামলাটিও থামেনি। জমি নদীতে বিলীন হওয়ার প্রায় ২৭ বছর পরও মালিকানা নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। আর মামলা শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ৩৮ বছর।

যে দুই চাচাতো ভাইয়ের বিরোধ থেকে এই মামলার শুরু, তারাও আজ বেঁচে নেই। বাদী সত্তার হাওলাদার মারা গেছেন ২০০২ সালে। তার চাচাতো ভাই ও মামলার বিবাদী জমির উদ্দিন হাওলাদার মারা যান ২০০৮ সালে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সঙ্গে মামলারও মৃত্যু হয়নি। বরং তাঁদের সন্তানরা এখন সেই মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঘটনাটি রতনপুর মৌজার ৩৬ নম্বর খতিয়ানের ২২ নম্বর দাগের আট শতাংশ জমি নিয়ে। জমিটির জে. এল. (জুরিডিকশন লিস্ট) নম্বর ২৭। ১৯৮৮ সালে বরিশালের একটি আদালতে আট শতাংশ জমি নিয়ে মামলা করেন সত্তার হাওলাদার। তার দাবি ছিল, জমিটি তাঁর। অন্যদিকে জমিটি ভোগদখলে রাখা তার চাচাতো ভাই জমির উদ্দিন হাওলাদার হন বিবাদী।

তখন প্রতি শতাংশ জমির দাম ছিল প্রায় দুই হাজার টাকা। অর্থাৎ আট শতাংশ জমির মূল্য ১৬ হাজার টাকা। অর্থের অঙ্কটি আজ ছোট মনে হলেও, তখন এটি ছিল একটি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ- উত্তরাধিকার, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ভূমিখণ্ড।

কেউ তখন ভাবেননি, ১৬ হাজার টাকার জমিকে ঘিরে শুরু হওয়া মামলা একদিন ৩৮ বছরের ইতিহাস হয়ে দাঁড়াবে। কেউ ভাবেননি, মামলার বয়স একসময় জমিটির অস্তিত্বের চেয়েও বড় হয়ে যাবে। আর কেউ ভাবেননি, যে জমির জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, সেই জমিই একদিন নদীর স্রোতে হারিয়ে যাবে। ১৯৯৯ সালে সেটিই ঘটে। মেঘনার শাখা লতা নদীর ভাঙনে রতনপুর মৌজার আট শতাংশ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। যেখানে একসময় জমি ছিল, সেখানে এখন নদীর পানি। নেই জমির সীমানা, নেই দখলের চিহ্ন। অথচ আদালতের নথিতে সেই জমি এখনো জীবিত- রয়ে গেছে মালিকানা নিয়ে বিরোধ, দাবি এবং মামলা।

জমি হারানোর পরও দুই মূল পক্ষ তখনো জীবিত ছিলেন। কিন্তু সময় তাদেরও ছাড়েনি। ২০০২ সালে মারা যান বাদী সত্তার হাওলাদার। ছয় বছর পর ২০০৮ সালে মারা যান বিবাদী জমির উদ্দিন হাওলাদার। তাদের সন্তানরা এরপর মামলার ভার নেন।

সত্তার হাওলাদারের বড় ছেলে আলী আকবর হাওলাদারের বয়স এখন ৬০ বছর। জমির উদ্দিন হাওলাদারের মেজ ছেলে কবির হাওলাদারের বয়স ৫৫ বছর। মামলা যখন শুরু হয়েছিল, তখন তাঁরা ছিলেন শিশু-কিশোর। আজ তারা নিজেদের বাবাদের শুরু করা মামলার উত্তরাধিকারী। তাদের জীবনের কয়েক দশক কেটে গেছে, শরীরে পড়েছে বয়সের ছাপ; কিন্তু মামলায় তার কোনো ছাপ নেই। সেটা চলছে আগের মতেতাই।

বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টের একটি দেওয়ানি বেঞ্চে বিচারাধীন। হাইকোর্টেই মামলাটি চলছে প্রায় এক দশক ধরে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার বিপ্লব হোসেন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলাটি অনেক পুরোনো এবং হাইকোর্টে প্রায় ১০ বছর ধরে চলছে। তিনি দুই পক্ষকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছেন—এত কম জমির মামলা আর কত দিন চালাবেন? তার ওপর জমিটিও এখন নদীর তলদেশে। কিন্তু কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। তবে আশা করছি চলতি বছরই এর রায় আসতে পারে।’ ব্যারিস্টার বিপ্লব হোসেন বলেন, দুই পক্ষ তাকে এমন কথাও বলেছেন যে, প্রয়োজনে তাঁরা মারা গেলেও আরও বহু বছর মামলা চলবে—নদীতে চর জেগে জমিটি আবার না জাগা পর্যন্ত।’

বাদীপক্ষের উত্তরাধিকারী আলী আকবর হাওলাদারের কাছেও এটি শুধু আট শতাংশ জমির বিষয় নয়। তার কাছে এটি বাবার সম্পত্তি ও পরিবারের অধিকার। আলী আকবর বলেন, ‘গত ৩৮ বছরে মামলার পেছনে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবু তিনি মামলা ছাড়তে রাজি নন। তাঁর ভাষায়, যত টাকাই খরচ হোক, তিনি কেন, তাঁর পরের প্রজন্মও জমিটি ছাড়বে না। তাঁরা না পাওয়া পর্যন্ত মামলা চলবে।’

বিবাদীপক্ষের উত্তরাধিকারী কবির হাওলাদারের অবস্থানও একই। তার দাবি, জমিটি তাঁর বাবার সম্পত্তি। মামলা চালাতে তাদেরও কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তারাও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চান।

অর্থাৎ জমি নেই, কিন্তু দাবি আছে। সীমানা নেই, কিন্তু মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে। দুই মূল দাবিদার নেই, কিন্তু তাঁদের সন্তানরা সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের পরের প্রজন্মও প্রয়োজনে এই লড়াই চালিয়ে যাবে- এমন কথাও উঠে এসেছে।

রতনপুরের এই আট শতাংশ জমির মামলা বাংলাদেশের ভূমি মামলার দীর্ঘসূত্রতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলেও ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের মামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। মালিকানা, দখল, খতিয়ান, নামজারি, দলিল, উত্তরাধিকার কিংবা সীমানা নিয়ে বিরোধ আদালতে গড়ালে তা বছরের পর বছর চলতে পারে।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে মোট ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি দেওয়ানি মামলা। শুধু অধস্তন আদালতেই বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের আদালতগুলোতে ২ লাখ ৮১ হাজার ৬৫৯টি ভূমি-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন ছিল বলে জানিয়েছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু।

ভূমি মামলা দীর্ঘ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জমির মালিকানা, দখল, খতিয়ান, নামজারি ও দলিল নিয়ে জটিলতা থাকে। একই জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের দাবি তৈরি হতে পারে। প্রাথমিক আদালতের রায়ের পর আপিল, রিভিশন ও উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকায় মামলাও দীর্ঘায়িত হয়। সাক্ষী হাজির না হওয়া, কাগজপত্র যাচাই, তদন্ত ও শুনানির তারিখ পেছানোও সময় বাড়ায়। এর সঙ্গে আদালতে মামলার বিপুল চাপ যুক্ত হলে নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে পক্ষগুলো আপস বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে না গিয়ে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে যান।’

হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবু তারিকও ভূমি মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে জমির কাগজপত্র ও মালিকানার ইতিহাসকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘একই জমির একাধিক দলিল, খতিয়ানে অসঙ্গতি, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ এবং দখলসংক্রান্ত সমস্যা থেকে মামলা তৈরি হয়। একটি মামলায় বহু পক্ষ যুক্ত হলে শুনানি ও প্রমাণ গ্রহণে সময় বাড়ে। আদালতে মামলার সংখ্যা বেশি থাকাও বড় কারণ। অনেক সময় পক্ষগুলো আপিল বা রিভিশনের সুযোগ নেন। সমঝোতার সুযোগ থাকলেও অনেকে তা গ্রহণ করেন না। ফলে একটি ভূমি মামলা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গড়াতে পারে।’

রতনপুরের আট শতাংশ জমির গল্প যেন সেই বাস্তবতারই এক চরম উদাহরণ। ১৯৮৮ সালে মামলা শুরু হয়েছিল ১৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি জমি নিয়ে। ১৯৯৯ সালে নদী সেই জমি নিয়ে গেছে। ২০০২ সালে মারা গেছেন বাদী, ২০০৮ সালে বিবাদী। তাঁদের সন্তানরা মামলার ভার নিয়েছেন। আর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মামলার বয়স ৩৮ বছর। এই ৩৮ বছরে বদলে গেছে মানুষের জীবন, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতি। বদলে গেছে নদীর গতিপথও। শুধু বদলায়নি আদালতের নথিতে থাকা সেই আট শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন।

তাই প্রশ্ন শুধু- জমিটি কার? প্রশ্ন আরও বড়—একটি জমির মালিকানা নির্ধারণে একটি মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি সময় কেন লাগবে? যে জমি ২৭ বছর আগে নদীর তলায় হারিয়ে গেছে, সেই জমির জন্য মানুষ এখনো আদালতে লড়ছেন কেন?

নদী মাটি সরিয়ে নিতে পারে, সীমানা মুছে দিতে পারে, একটি জমিকে দৃশ্যমান পৃথিবী থেকে অদৃশ্য করে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের মনে গেঁথে থাকা মালিকানার দাবি সরিয়ে নিতে পারে না। হয়তো একদিন এই মামলার রায় হবে। আদালত বলবে জমিটি কার ছিল। কোনো এক পক্ষ স্বস্তি পাবে, অন্য পক্ষ হতাশ হবে। কিন্তু ৩৮ বছর আর ফিরে আসবে না। যে দুই চাচাতো ভাই মামলা শুরু করেছিলেন, তারা কেউ সেই রায় দেখে যেতে পারেননি। যে জমিকে ঘিরে তাঁদের বিরোধ, সেই জমিও এখন নদীর তলায়।

নদী তার স্রোতে জমি নিয়ে গেছে। সময় নিয়ে গেছে দুই মূল দাবিদারকে। কিন্তু মামলা এখনো চলছে উত্তরাধিকারীদের হাতে, আদালতের নথিতে এবং দুই পরিবারের অনড় দাবির মধ্যে। আপাতত বাস্তবতা একটাই- ২৭ বছর ধরে যে জমি নদীর তলায়, সেটার জন্য ৩৮ বছর মামলা চলছে আদালতপাড়ায়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ