Views Bangladesh Logo

জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় পুলিশ হত্যার ২০ মামলা ফাইলবন্দি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যকে ঘিরে করা ২০টি হত্যা মামলা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত নীরবে ফাইলবন্দি রয়েছে। নিহতদের স্বজনরা গত বছর দেশের বিভিন্ন থানায় এসব মামলা দায়ের করলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেনি পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমিত করা, নিহত সদস্যদের ঘটনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে অপপ্রচার মোকাবিলার জন্যই এসব মামলা রেকর্ড করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৩ জন পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর), ১১ জন উপ-পরিদর্শক (এসআই), ৭ জন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এবং এটিএসআই, নায়েক ও কনস্টেবল পদমর্যাদার ২৩ জন সদস্য।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রাজারবাগে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের ঘটনাগুলোকে ফৌজদারি মামলার আওতায় আনা হয়। একই সঙ্গে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে পুলিশ সদস্য নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও প্রচারণা ছড়ানোর অভিযোগ ওঠায় প্রকৃত তথ্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের আইনি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেও মামলাগুলো করা হয়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পুলিশ সদর দপ্তর প্রথমবারের মতো নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে পুলিশ নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এ কারণে সরকারিভাবে যাচাই করা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে এবং তালিকার বাইরে কেউ নিহত হয়ে থাকলে তার প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে গত ১৫ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ অনুমোদন করে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক প্রতিরোধের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীরা আইনি সুরক্ষা পাবেন। এর ফলে ওই সময়ের অনেক ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার বা নতুন মামলা গ্রহণে আইনগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত লোভ, প্রতিহিংসা বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এই দায়মুক্তির আওতার বাইরে থাকবে।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ৫ আগস্ট। সেদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতায় ২৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন, যা এক দিনে পুলিশের সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।

এর আগের দিন ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় একসঙ্গে ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), একাধিক এসআই, একজন এএসআই এবং কয়েকজন কনস্টেবল ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একক কোনো থানায় হামলায় এতসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত সদস্যরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানা, কুমিল্লার তিতাস থানা, চাঁদপুরের কচুয়া থানা, হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), হাইওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, খুলনা ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং ঢাকা জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিত তালিকায় প্রত্যেক সদস্যের কর্মস্থল, জেলা, মৃত্যুর তারিখ ও ঘটনাস্থলও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ওই সময়ে পুলিশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির একটি সরকারি চিত্র তুলে ধরে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা অনুযায়ী নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্য হলেন—পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) রাশেদুল ইসলাম, পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) মো. আব্দুর রাজ্জাক, পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া, উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুজন চন্দ্র দে, উপ-পরিদর্শক (এসআই) খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার, উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মামুনুর রশিদ সরকার, উপ-পরিদর্শক (এসআই) বশির উদ্দিন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) রইস উদ্দিন খান, উপ-পরিদর্শক (এসআই) তহছেনুজ্জামান, উপ-পরিদর্শক (এসআই) প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নাজমুল হোসাইন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান মোল্লা, উপ-পরিদর্শক (এসআই) সন্তোষ চৌধুরী, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সঞ্জয় কুমার দাস, এএসআই ফিরোজ হোসেন, এএসআই সোহেল রানা, এএসআই রাজু আহমেদ, এএসআই ওবায়দুর রহমান, এএসআই রফিকুল ইসলাম, এএসআই মো. মুক্তাদির, এটিএসআই আলী হোসেন চৌধুরী, নায়েক গিয়াস উদ্দিন, কনস্টেবল আব্দুল মজিদ, কনস্টেবল রেজাউল করিম, কনস্টেবল মাহফুজুর রহমান, কনস্টেবল শহিদুল আলম, কনস্টেবল আবু হাছনাত রনি, কনস্টেবল মীর মনতাজ আলী, কনস্টেবল সুমন কুমার ঘরামী, কনস্টেবল আব্দুল মালেক, কনস্টেবল মঈনউদ্দিন লিটন, কনস্টেবল মোহাম্মদ ইব্রাহিম, কনস্টেবল মো. আব্দুস সালেক, কনস্টেবল মো. হাফিজুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. রবিউল আলম শাহ, কনস্টেবল মো. হুমায়ুন কবির, কনস্টেবল মো. আরিফুল আযম, কনস্টেবল মো. রিয়াজুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. শাহিন উদ্দিন, কনস্টেবল মো. হানিফ আলী, কনস্টেবল এরশাদ আলী, কনস্টেবল সুজন মিয়া এবং কনস্টেবল খলিলুর রহমান।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এই তালিকা শুধু নিহত সদস্যদের পরিচয় নয়; ভবিষ্যতের তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পারিবারিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রের নথিতে জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় পুলিশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ