৯ মাসে মব সহিংসতায় ১৭১ প্রাণহানি, আইনের শাসন কোথায়?
আইনের আদালতে অভিযোগের বিচার হওয়ার কথা, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়ার কথা রাষ্ট্রের। অথচ দেশে ক্রমেই উল্টো দৃশ্য দৃশ্যমান। অভিযোগ উঠছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে উত্তেজনা, জড়ো হচ্ছে জনতা; তারপর বিচার ছাড়াই নেমে আসছে শাস্তির নামে সহিংসতা। কখনো সেই সহিংসতার পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের হত্যাকাণ্ড থেকে ঢাকার ধামরাইয়ে ছাত্রদল নেতাকে সংঘবদ্ধভাবে মারধরের অভিযোগ- সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, দেশে কি মবের রাজত্ব চলতেই থাকবে?
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭১ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৩, চট্টগ্রামে ৩৯ ও খুলনায় ২২ জন।
অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই-সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪ জন, আহত ১৪৫ জন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা ও ব্যক্তিগত বিরোধসহ নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে।
পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা একেকটি প্রাণ, একেকটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। অথচ অনেক ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করার ন্যূনতম ধৈর্যও দেখা যাচ্ছে না। ‘মব’ পরিচয়ের আড়ালে ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা পরিকল্পিত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও ক্রমে জোরালো হচ্ছে।
সাতক্ষীরার দেবহাটায় শামীম হত্যার ঘটনাটি এই প্রবণতার ভয়াবহ উদাহরণ। ১৩ অক্টোবর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁর ওপর হামলা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবারের দাবি, শামীম মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর কথাবার্তার একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা তৈরি হয়। ফেসবুক লাইভে জনতাকে জড়ো করার অভিযোগও উঠেছে। প্রথম দফায় হামলার পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। কিন্তু সেখানেও দ্বিতীয় দফায় হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে ফজলুল হকের নাম এসেছে। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে অভিযোগের সত্যতা এবং প্রত্যেকের দায় নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও আদালতের।
এরই মধ্যে ১৬ অক্টোবর ধামরাইয়ে ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমান ইমনকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ সামনে আসে। বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একাধিক মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিরা তাঁর গাড়ির পথরোধ করেন। ইমন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোকসেদ ও তাঁর অনুসারীদের দায়ী করেছেন। তবে অভিযুক্তের পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। পুলিশ গাড়ি থেকে গাঁজা উদ্ধারের দাবি করেছে, যা ইমন অস্বীকার করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'সংঘবদ্ধ অপরাধকে শুধু মব সহিংসতা হিসেবে দেখিয়ে তার গুরুত্ব কমানোর সুযোগ নেই। পরিকল্পিত হত্যা বা গুরুতর আঘাতের ঘটনায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে আইন অমান্য করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি শনাক্ত ও প্রতিরোধে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও আরও বাড়ানো প্রয়োজন।'
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. তৌহিদুল হক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু হামলার পর মামলা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; জনতা কীভাবে জড়ো হলো, কে উসকানি দিল, হামলায় কারা নেতৃত্ব দিল এবং পরিকল্পিত অপরাধের যোগসূত্র আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক খন্দকার ফারজানা রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'আইন দুর্বল হলে জনতার ক্রোধ বিচারকের আসনে বসে, আর গুজব হয়ে ওঠে রায়ের ভিত্তি। আজ যে মানুষ অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে জনতাকে উসকে দিচ্ছে, কাল সেই জনতার লক্ষ্য হতে পারেন যে কেউ। তাই গণপিটুনি প্রতিরোধের লড়াই শুধু অপরাধ দমনের নয়; এটি মানুষের জীবন, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের আইনের শাসন রক্ষার লড়াই। বাংলাদেশকে ‘মবের মুল্লুক’ হওয়ার ঝুঁকি থেকে ফেরাতে হলে কথার কঠোরতার চেয়ে জরুরি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।'
মতামত দিন