Views Bangladesh Logo

শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি সারতে তৎপর নির্বাচন কমিশন

গামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে শেষ সপ্তাহের প্রস্তুতি জোরদার করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, ব্যালট পরিবহন, ভোটার অংশগ্রহণ, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমন্বয়—সবকিছুই এখন কমিশনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচন ঘিরে কমিশনের সব বিভাগ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) সক্রিয় করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষক দল মাঠে থাকবে এবং কেন্দ্রভিত্তিক পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে মনিটর করা হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাই শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি সারছেন।

ব্যালট পেপার পাঠানো শুরু:
নির্বাচনের শেষ ধাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আসনভিত্তিক প্রার্থীর নাম ও প্রতীক সংবলিত ব্যালট পেপার সংশ্লিষ্ট জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উপসচিব রাশেদুল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, রোববার ঢাকা থেকে ১৩টি জেলায় ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে—মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, লক্ষ্মীপুর, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি। সোমবার পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট জেলার সব আসনের ব্যালট পেপার মুদ্রণ শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে সেগুলো পাঠানো হচ্ছে। আগামী ৮ বা ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সব জেলায় ব্যালট পেপার পাঠানো সম্পন্ন হবে। ভোটের আগের দিন কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে গণভোটের ব্যালট পেপার পাঠানো শেষ হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ব্যালট পরিবহনে জিপিএস-মনিটরিং ও সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে, যেন পরিবহন প্রক্রিয়া শতভাগ নিরাপদ থাকে। এসব কাজ এখন দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হচ্ছে।

ভোটার অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগ:
ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে কমিশন শেষ সময়ে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য অনলাইন নিবন্ধন চালু রয়েছে এবং পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার আওতায় ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে ১৩ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। ইসি বলছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।

প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি:
ইসির ইলেকটোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সারা দেশে ১০ লাখের বেশি নির্বাচন কর্মকর্তা—প্রিজাইডিং, অ্যাসিস্ট্যান্ট ও পোলিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে যার ফলোআপ নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে ফলাফল দ্রুত পাঠাতে ডিজিটাল রেজাল্ট ট্রান্সমিশন সিস্টেম পরীক্ষামূলকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। বাস্তব ভোটের অভিজ্ঞতা দিতে বিভিন্ন এলাকায় ‘মক ভোটিং’ কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে ভোটার ও কর্মকর্তারা প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হন।

ইসির সঙ্গে শেষ দফার সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো:
নির্বাচনের আগে শেষবারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশন এ, এম, এম, নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ইসি সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষক নিয়োগ, ব্যালট নিরাপত্তা ও ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছতা নিয়ে দলগুলোর মতামত ও উদ্বেগ শোনা হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং যে কোনো অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত রোববার বিএনপি ও জামায়াতসহ ৬টি রাজনৈতিক দল ও সোমবার এনসিপিসহ আরো ৫টি রাজনৈতিক দল ইসির সঙ্গে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষক নিয়োগ, ব্যালট নিরাপত্তা ও ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। চলতি সপ্তাহ জুড়ে এই কার্যক্রম চলবে।

শেষ মূহুর্তের নিরাপত্তা প্রস্তুতি:
নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
দেশব্যাপী প্রায় ৯ লক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য নির্বাচন ও গণভোট‑সম্পর্কিত নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় ১,৫০,০০০, সেনাবাহিনীর প্রায় ৩০,০০০ ও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের সদস্য প্রায় ৬৫০,০০০ সদস্য ভোটের দিন বিভিন্ন কেন্দ্র ও পরিবেশ‑মনিটরিং দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে বিশেষভাবে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৮,৭৮০টি ভোটকেন্দ্র উচ্চ সতর্কতায় রাখা হবে এবং এখানে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা মোতায়েন থাকবে।


নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োগপ্রাপ্তদের ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা এলাকায় পাঠানো প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। যা চলতি সপ্তাহে শেষ হবে। এরপর তারা যার যার এলাকায় ক্যাম্প করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে কাজ করবেন।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ও ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) প্রস্তুত করতে শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে নির্বাচন কমিশন। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সব কার্যক্রম শেষ হবে। এই সময়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসি নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জ হলেও নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। আমরা আমাদের প্রস্তুতি ও রোডম্যাপ অনুযায়ী শেষ সময়ের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

ইসি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে ৬৪ জেলার ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ