ইয়ামাল-রদ্রি বনাম ডি ব্রুইনে-লুকাকু: ইউরোপের দুই পরাশক্তির মহারণ
২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় কোয়ার্টার ফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি স্পেন ও বেলজিয়াম। একদিকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সংগঠিত ও দুর্ভেদ্য রক্ষণ, অন্যদিকে ক্রমেই ছন্দে ফেরা এক বিধ্বংসী আক্রমণভাগ। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টায়, বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ১টায়।
ফর্মে ফিরছে বেলজিয়াম
রুডি গার্সিয়ার অধীনে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ যাত্রার শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। গ্রুপ 'জি'-এর শীর্ষে উঠলেও তাদের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা ছিল না। তবে নকআউট পর্বে এসে একেবারেই বদলে গেছে রেড ডেভিলসদের চেহারা।
শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারানোর পর শেষ ষোলোয় সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে জোড়া গোল করেন চার্লস ডি কেটেলার। পরে হান্স ভানাকেন ও বদলি হিসেবে নেমে রোমেলু লুকাকু আরও দুটি গোল যোগ করেন। মজার বিষয় হলো, এবারের বিশ্বকাপে লুকাকুর তিনটি গোলই এসেছে বেঞ্চ থেকে নেমে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল ক্যামেরুন কিংবদন্তি রজার মিলা—১৯৯০ সালে, চারটি।
শুধু ফল নয়, পরিসংখ্যানও বলছে আক্রমণে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে বেলজিয়াম। এই বিশ্বকাপে তাদের শট থেকে গোলের হার ১২.১ শতাংশ, যা ১৯৬৬ সালের পর বেলজিয়ামের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পাঁচ ম্যাচে মোট ১০৭টি শট নিয়ে ম্যাচপ্রতি গড়ে ২১.৪টি শট নিচ্ছে তারা, যা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স। অর্থাৎ সুযোগ তৈরি এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানো—দুই ক্ষেত্রেই এখন অনেক বেশি কার্যকর গার্সিয়ার দল।
সামনে স্পেনের অভেদ্য প্রাচীর
বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা অবশ্য অপেক্ষা করছে স্পেনের রক্ষণের সামনে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একটিও গোল হজম করেনি। শেষ ষোলোয় পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে তারা টানা ষষ্ঠ ম্যাচে ক্লিন শিট ধরে রেখেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড।
সংখ্যাগুলো আরও বিস্ময়কর: বিশ্বকাপে টানা ১০ ঘণ্টা ৯ মিনিট কোনো গোল হজম করেনি স্পেন। এই টুর্নামেন্টে তাদের ম্যাচপ্রতি প্রত্যাশিত গোল হজমের (এক্সপেক্টেড গোলস) গড় মাত্র ০.৩০, যা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে কোনো দলের অন্যতম সেরা রক্ষণাত্মক রেকর্ড। অর্থাৎ শুধু গোলই খায়নি তা নয়, প্রতিপক্ষকে বড় সুযোগ তৈরি করতেও দেয়নি স্পেন।
ইয়ামাল-রদ্রির নেতৃত্বে নতুন স্পেন
আক্রমণে স্পেনের অন্যতম ভরসা তরুণ লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি এই বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ১৭টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো টিনএজ ফুটবলারের এর চেয়ে বেশি সফল ড্রিবল আছে কেবল কিলিয়ান এমবাপ্পে (২২) ও জামাল মুসিয়ালার (১৯)।
অন্যদিকে মাঝমাঠে রদ্রি হয়ে উঠেছেন দলের আসল নিয়ন্ত্রক। এবারের বিশ্বকাপে তার ৮০টি লাইন-ব্রেকিং পাস ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের পর কোনো স্প্যানিশ খেলোয়াড়ের অন্যতম সেরা পরিসংখ্যান। রদ্রির পাসিং, পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং ইয়ামালের গতি—এই ত্রয়ীই স্পেনকে আবারও বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদারে পরিণত করেছে।
স্পেনের দুশ্চিন্তা স্ট্রাইকারদের অফফর্ম
তবে স্পেনের একটি বড় দুর্বলতাও রয়েছে। অধিনায়ক ও মূল স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারজাবাল গ্রুপ পর্বে ভালো খেললেও নকআউটে শক্তিশালী রক্ষণের বিপক্ষে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। অন্য দুই ফরোয়ার্ড বোরহা ইগলেসিয়াস ও ফেরান তোরেসও এখনো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। ফলে গোলের জন্য স্পেনকে অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে মিডফিল্ডারদের ওপর; পর্তুগালের বিপক্ষে জয়সূচক একমাত্র গোলটিও করেছিলেন মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিকো উইলিয়ামসের চোট। বাঁ প্রান্তে তার গতি ও ড্রিবলিং স্পেনের আক্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করত। তার অনুপস্থিতিতে ইয়ামালের ওপর সৃজনশীলতার চাপ আরও বেড়েছে, স্পেনের আক্রমণ কিছুটা অনুমানযোগ্য হয়ে পড়ার শঙ্কাও আছে। তবে বলের দখল, পজিশনাল ফুটবল ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে সেই দুর্বলতা অনেকটাই ঢেকে রাখতে পেরেছে দে লা ফুয়েন্তের দল।
ইতিহাসও দে লা ফুয়েন্তেকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। তার অধীনে স্পেন বড় টুর্নামেন্টের ছয়টি নকআউট টাইয়ের সবকটিতেই পরের পর্বে উঠেছে। ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে প্রথম সাতটি নকআউট টাইয়ের সবকটি জেতার কীর্তি আছে ইতিহাসে মাত্র দুজন কোচের—ভিত্তোরিও পোজ্জো (ইতালি, ১৯৩৪-১৯৩৮) ও ভিসেন্তে দেল বস্ক (স্পেন, ২০১০-২০১২)। আজ জিতলে সেই তালিকায় নাম লেখাবেন দে লা ফুয়েন্তেও।
দুই কোচের ট্যাকটিক্যাল লড়াই
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটিই হতে যাচ্ছে পুরো বিশ্বকাপের সবচেয়ে কৌশলগত ম্যাচ।
স্পেন সাধারণত খেলে ৪-৩-৩ ফরমেশনে। ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়া, বলের দখল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়াই তাদের মূল দর্শন। রদ্রি ডিপ-লাইং প্লেমেকার হিসেবে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, পেদ্রি ও মেরিনো মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে সমর্থন দেন, আর দুই ফুলব্যাক ওপরে উঠে মাঠ প্রশস্ত করেন। ইয়ামাল ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে সুযোগ তৈরি করেন।
অন্যদিকে গার্সিয়ার বেলজিয়াম সম্ভবত খেলবে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে। অপেক্ষাকৃত নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজিয়ে বল কেড়ে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকই হবে তাদের প্রধান অস্ত্র। কেভিন ডি ব্রুইনের সৃজনশীলতা, জেরেমি ডোকুর গতি এবং বক্সের ভেতর ডি কেটেলারের সুযোগ তৈরির ক্ষমতা স্পেনের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে। লুকাকুকে আবারও 'সুপার-সাব' হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও প্রবল—ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে তার শক্তি ও ফিনিশিং বেলজিয়ামের বড় অস্ত্র হতে পারে।
ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে কয়েকটি দ্বৈরথ: মাঝমাঠে রদ্রি বনাম ডি ব্রুইনে—নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, ম্যাচের গতিও ঠিক করবে তারাই। ইয়ামালকে থামাতে পারলে ভোঁতা হয়ে যেতে পারে স্পেনের আক্রমণ, আবার দ্রুত ট্রানজিশনে ডোকু জায়গা পেলে বিপদে পড়তে পারে স্পেনের রক্ষণই। আর শেষ আধা ঘণ্টায় লুকাকু নামলে বদলে যেতে পারে ম্যাচের মোড়।
সব মিলিয়ে এটি শুধু দুই দলের নয়, দুই কোচের কৌশলগত দাবা খেলাও। স্পেন চাইবে দীর্ঘ সময় বল দখলে রেখে বেলজিয়ামকে ক্লান্ত করতে, আর বেলজিয়াম অপেক্ষায় থাকবে স্পেনের একটি ভুলের—যাতে কাউন্টার অ্যাটাকে বদলে দেওয়া যায় ম্যাচের ভাগ্য।
ইতিহাস স্পেনের পক্ষে
সাম্প্রতিক ইতিহাস অবশ্য স্পেনকেই এগিয়ে রাখছে। ১৯৮০ সালের ইউরোতে হারের পর বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ১১ ম্যাচে অপরাজিত স্পেন—৯ জয়, ২ ড্র। শেষ পাঁচ ম্যাচে গোল ব্যবধান ১৩-১!
তবে বিশ্বকাপের স্মৃতি বেলজিয়ামের জন্য সুখকর। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ১-১ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে স্পেনকে বিদায় করেছিল বেলজিয়াম। চার বছর পর ১৯৯০-এ গ্রুপ পর্বে অবশ্য ২-১ ব্যবধানে জেতে স্পেন।
কাগজে-কলমে স্পেন কিছুটা এগিয়ে—তাদের রক্ষণ টুর্নামেন্টের সেরা, মাঝমাঠ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, আর দে লা ফুয়েন্তের অধীনে বড় ম্যাচে সাফল্যের হারও ঈর্ষণীয়। তবে বেলজিয়ামের বর্তমান আক্রমণভাগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। স্পেন ১-০ বা ২-১ ব্যবধানে সামান্য ফেবারিট হলেও এটি এমন এক ম্যাচ, যা সহজেই গড়াতে পারে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে। যে দল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে এবং প্রতিপক্ষের সামান্য ভুল কাজে লাগাতে পারবে, সেমিফাইনালের টিকিট কাটবে তারাই।
মতামত দিন