ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি পুরুষ, মৃত্যু বেশি নারীর; কারণটা কেউ খুঁজে দেখেনি
প্রতিদিন বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। গণমাধ্যম রুটিন কাজের মতো প্রকাশ করে, আর রাষ্ট্রীয় হাজার সমস্যার ভিতরে ডেঙ্গুতে কী হচ্ছে তা পাঠককে সাড়া জাগায় না কিংবা ভাবায় না। অধিদপ্তরের ৩০ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তিতে ছিল, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৫৩ জন—তাঁদের মধ্যে ৩২ জন নারী, ২১ জন পুরুষ। সংখ্যাটি নতুন নয়। নতুন নয় অনুপাতটিও। ২০১৯ সালে আইইডিসিআরের বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৬৫ শতাংশই পুরুষ। অথচ সে বছর মৃতদের প্রায় ৫৪ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২৪ সালে মৃতদের ৫১ দশমিক ২ শতাংশ নারী। এ বছর এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শুধু ২৬ থেকে ৩০ জুলাই—এই চার দিনে যে দশজন মারা গেছেন, তাঁদের সাতজনই নারী।
অর্থাৎ কম নারী হাসপাতালে যাচ্ছেন, বেশি নারী মারা যাচ্ছেন। এটি পরিসংখ্যানের খামখেয়ালি নয়; এটি একটি ধারাবাহিক, পুনরাবৃত্ত এবং পরিমাপযোগ্য বৈষম্য।
প্রশ্ন হলো, কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে একটিই শব্দ আছে—‘সম্ভবত’।
সম্ভবত দেরি। ডেঙ্গুতে চিকিৎসা মানে মূলত সময়মতো তরল ব্যবস্থাপনা। আইইডিসিআর নিজেই বলছে, দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারলে মৃত্যুহার এক শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব। এখানে সময়ই একমাত্র মুদ্রা। আর সেই সময়টুকুই নারীদের ক্ষেত্রে হারিয়ে যায় সবচেয়ে বেশি।
কেন হারায়, তার ব্যাখ্যা চিকিৎসাশাস্ত্রের চেয়ে বেশি সামাজিক। ঘরের কেউ জ্বরে পড়লে কাকে আগে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত অনেক পরিবারেই নারীর নিজের হাতে থাকে না। গৃহস্থালির কাজ চালিয়ে যাওয়ার চাপে জ্বরকে ‘সাধারণ জ্বর’ ধরে নিয়ে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল এনে কাটিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও তাঁদের মধ্যে বেশি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানে রান্না বন্ধ, বাচ্চার দেখাশোনা বন্ধ, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা বন্ধ—এই হিসাবটিও অনেক সময় সিদ্ধান্তকে দুদিন পেছনে ঠেলে দেয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ওই দুদিনই যথেষ্ট।
সম্ভবত বারবার আক্রান্ত হওয়া। ডেঙ্গুর একাধিক ধরন আছে; একবার এক ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনে আক্রান্ত হলে রোগ জটিল আকার নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত। এডিস মশা কামড়ায় দিনের বেলায়। আর দিনের বড় অংশ ঘরে ও তার আশপাশে কাটে এমন মানুষের সংখ্যায় নারীরাই এগিয়ে—গৃহিণী, বাড়িতে থাকা বয়স্ক নারী, ঘরে বসে কাজ করা নারী। বাড়ির কোণে জমে থাকা পানিতে যে মশা জন্মায়, তার সবচেয়ে কাছের মানুষটি কে, সে প্রশ্নের উত্তর কঠিন নয়।
সম্ভবত শরীরেরই কিছু বাস্তবতা। এবং এই কারণটি নিয়েই সবচেয়ে কম কথা হয়। ডেঙ্গুতে রক্তের অণুচক্রিকা কমে যায়, রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। মাসিক চলাকালে বা গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর এটিকে সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।
অথচ এই কথাটি কোথাও বলা হয় না। টেলিভিশনে ও পোস্টারে যা বলা হয়, তা সবার জন্য এক—পানি জমতে দেবেন না, মশারি টাঙান, জ্বর হলে ডাক্তার দেখান। ভালো পরামর্শ। কিন্তু কোন প্রচারে বলা হয়েছে যে মাসিকের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ ডেঙ্গুর একটি বিপদচিহ্ন, অপেক্ষা না করে হাসপাতালে যাওয়ার সংকেত? কোন পোস্টারে লেখা আছে যে গর্ভবতী নারীর ডেঙ্গু ধরা পড়লে শুরু থেকেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা দরকার?
আমাদের সমাজে যে বিষয়টি নিয়ে মেয়েরা মাকে বলতেও সংকোচ করেন, সেটি নিয়ে জীবন বাঁচানোর তথ্য দেওয়া হবে না—এই নীরবতার দাম কে দিচ্ছে, তা ওই ৩২ সংখ্যাটির মধ্যেই আছে।
একইভাবে অজানা থেকে যায় সেই তথ্যটিও, যা সবার জানা দরকার: ডেঙ্গুতে জ্বর নেমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। অনেকে ভাবেন সেরে উঠছেন, অথচ তখনই জটিলতা শুরু হয়। পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, দাঁতের গোড়া বা নাক দিয়ে রক্তপাত, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অস্থিরতা বা নিস্তেজ হয়ে পড়া—এর যেকোনো একটি দেখা দিলে হাসপাতালে যেতে হবে। এই বার্তাগুলো যদি স্পষ্টভাবে, বারবার, নারীর দৈনন্দিন বাস্তবতার ভাষায় পৌঁছাত, কিছু মৃত্যু হয়তো ঠেকানো যেত।
কিন্তু এই সব ‘সম্ভবত’-র মধ্যে একটিও প্রমাণিত নয়। কারণ বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যুহার কেন বেশি, তা নিয়ে কোনো গবেষণাই হয়নি।
এইখানেই আসল কথাটি। বিশ্বে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহারে বাংলাদেশ শীর্ষে। ২০২৩ সালে এক বছরেই মারা গেছেন ১ হাজার ৭০৫ জন। বছরের পর বছর প্রতিটি মৃত্যুর তালিকায় নারীর সংখ্যা বেশি থাকছে। অথচ কেন বেশি, তা খুঁজে দেখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এটি জ্ঞানের অভাব নয়, আগ্রহের অভাব।
কারণ তথ্যটি তো আমাদের হাতেই আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিটি ডেঙ্গু-মৃত্যুর ‘ডেথ রিভিউ’ করে। সেই পর্যালোচনায় লিঙ্গ লেখা হয়। তাই তো আমরা ৩২ আর ২১ সংখ্যাটি জানতে পারি। কিন্তু সেখানে আর কয়েকটি ঘর যোগ করা কি এতই কঠিন? জ্বর শুরুর কত দিন পর রোগী হাসপাতালে পৌঁছেছেন? তার আগে কতবার ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া হয়েছে? হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছিলেন? মৃত নারী কি গর্ভবতী ছিলেন, নাকি মাসিক চলছিল? রক্তক্ষরণ কোথা থেকে শুরু হয়েছিল?
এই কয়েকটি ঘর পূরণ করতে নতুন প্রকল্প লাগে না, বিদেশি অনুদান লাগে না, নতুন জনবলও লাগে না। লাগে কেবল সিদ্ধান্ত—যে প্রশ্নটি আমরা করব।
আর কেউ বলতে পারেন, ‘নারীদের সচেতন হতে হবে’। কথাটি বলে দায়িত্ব সেরে ফেলা সহজ। কিন্তু সচেতনতা দাঁড়ায় তথ্যের ওপর, আর তথ্যটি আমরা তাঁদের দিইনি। তার চেয়েও বড় কথা, সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। একজন নারী নিজে বুঝতে পারলেও হাসপাতালে যাওয়া তাঁর একার সিদ্ধান্ত নয়। পরিবহন, সঙ্গে যাওয়ার লোক, বাচ্চা কার কাছে থাকবে, পরীক্ষার খরচ কে দেবে—প্রতিটি ধাপে একটি করে বাধা। এগুলো ব্যক্তিগত অসচেতনতা নয়, কাঠামোগত বাস্তবতা। আর কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত পরামর্শে হয় না।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম। এ বছরের প্রথম সাত মাসে যে ৫০ জন মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের ৩২ জনেরই মৃত্যু হয়েছে কেবল জুলাই মাসে। সামনের সংখ্যাগুলো আরও বাড়বে, এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই সেখানে নারীর সংখ্যা বেশি থাকবে।
তখনো আমরা বিজ্ঞপ্তি পাঠাব, তালিকা ছাপব, শিরোনাম করব। প্রশ্ন হলো, পরের বছর ঠিক এই দিনে ‘সম্ভবত’ ছাড়া বলার মতো নতুন কিছু কি আমাদের থাকবে?
শিমুল জাবালি। কবি ও সাংবাদিক
মতামত দিন