আমগাছটি না থাকলে মারাই যেতাম: বিবেক কুমাল
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ। এমন ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন ২৪ বছর বয়সী দিনমজুর বিবেক কুমাল। প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও একটি আমগাছ আটকে দেয় তার মৃত্যুযাত্রা।
বুধবার নেপালের বিদুর এলাকায় একটি নবনির্মিত বাড়ির বাইরে শৌচাগারের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন কুমাল। হঠাৎ তিনি শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান। প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্তের ওপরে থাকা চার সহকর্মী তাকে দ্রুত উঠে নিরাপদে সরে যেতে বলেন।
কুমাল কোনোমতে গর্ত থেকে উঠে দৌড় শুরু করার পরপরই পানি, কাদা ও পাথরের ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। প্রবল স্রোতে তিনি ভাটির দিকে ভেসে যেতে থাকেন।
কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন কুমাল রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো প্রচণ্ড শব্দে পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে।’
স্রোতের সঙ্গে ভেসে যেতে যেতে একপর্যায়ে একটি আমগাছে আটকে যান তিনি। সেই গাছটিই শেষ পর্যন্ত তার জীবন বাঁচায়।
কুমাল বলেন, ভাগ্য ভালো, আমি একটি আমগাছে আটকে গিয়েছিলাম। ওই আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমি মারাই যেতাম।
আমগাছটি আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায় চোখের সামনে তিনি দেখতে পান, যে বাড়িতে কাজ করছিলেন সেটিও প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। প্রথমে পানির স্রোত এবং পরে একটি বড় পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে চোট লাগে।
বন্যায় আহত আরও তিনজন কুমালের সঙ্গে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্গত বিভিন্ন এলাকা থেকে আহত আরও অনেক মানুষকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের উজানে নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর ধসে পড়ার পর এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রবল স্রোতে ভাটির জনবসতি ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসার আগে অনেক মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। পরে সেই স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে ধারণ করা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
নেপালে বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। দেশটি বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে। কুমাল নিজেও কিশোর বয়সে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
এদিকে একই হাসপাতালে কুমালের বিপরীত পাশের বিছানায় চিকিৎসাধীন ১১ বছর বয়সী রিহানা লামিছানেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছে।
রিহানা বলে, আমি স্কুলে ছিলাম। বন্যার কারণে স্কুল বন্ধ করে আমাদের বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল বেগে বন্যার পানি নেমে আসে।
বন্যায় রিহানার বুক ও পায়ে আঘাত লেগেছে। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে সে বলে, নিরাপদে আছি, এটাই আনন্দের। তবে আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, এখনও আমি জানি না।
রিহানার মা রিতা জানান, এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পর তিনি মেয়েকে খুঁজতে ছুটে যান। মেয়েকে নিরাপদে ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের গুরুতর কিছু হয়নি, এতেই আমি খুশি। তাকে নিরাপদে পেয়ে স্বস্তি লাগছে।
মতামত দিন