একলা হাঁটা ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’ কেন আলোচনায়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অদ্ভুত কিন্তু ‘গভীর অর্থবাহী’ ভিডিও ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। ভিডিওতে দেখা যায়—একটি পেঙ্গুইন তার দল ও সমুদ্রের দিক ছেড়ে উল্টো পথে, বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে একা হেঁটে যাচ্ছে। কোথাও নেই খাবার, নেই সঙ্গী, নেই ফেরার কোনো নিশ্চয়তা। এই দৃশ্যটিকে ঘিরে নেটিজেনরা নাম দিয়েছেন ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’, কেউ কেউ বলছেন ‘বিদ্রোহী পেঙ্গুইন’।
কেউ এই দৃশ্যের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন জীবনের অর্থহীনতা, একাকীত্ব ও ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি। কেউ আবার দেখছেন সামাজিক নিয়ম, চাপ ও কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার প্রতীক। তবে প্রশ্ন হলো—এই পেঙ্গুইন কি সত্যিই কোনো দর্শন বা বিদ্রোহের পথে হাঁটছে, না কি বাস্তবতা আরও কঠিন?
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আদতে নতুন নয়। এটি ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত জার্মান পরিচালক ভার্নার হার্জগ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র Encounters at the End of the World–এর একটি অংশ। ডকুমেন্টারিটি অ্যান্টার্কটিকার প্রকৃতি, গবেষক জীবন ও প্রাণিজগতের অদ্ভুত ও কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে।
ভিডিওতে যে পেঙ্গুইনটিকে দেখা যায়, সেটি অ্যাডেলি প্রজাতির। এই প্রজাতির পেঙ্গুইন সাধারণত দলবদ্ধভাবে থাকে, সমুদ্রঘেঁষা এলাকায় বসবাস করে এবং তাদের জীবন সম্পূর্ণভাবে সাগরনির্ভর।
ডকুমেন্টারিতে হার্জগ এই দৃশ্যটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে ‘ডেথ মার্চ’ বা ‘মরণযাত্রা’ বলে আখ্যা দেন। কারণ, পেঙ্গুইনটি প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে হাঁটছিল—যেখানে না আছে খাবার, না আছে দল, না আছে বেঁচে থাকার বাস্তব সম্ভাবনা।
পেঙ্গুইন সাধারণত কখনোই এভাবে পাহাড়ের দিকে যায় না। তাদের খাবার মাছ, স্কুইডসহ সামুদ্রিক প্রাণী—সবই সাগরে। সেখানেই তাদের কলোনি, সেখানেই প্রজনন ও সামাজিক জীবন।
প্রাণীবিদদের মতে, এ ধরনের আচরণের পেছনে থাকতে পারে—দিকভ্রান্তি বা নেভিগেশনের সমস্যায় ভুল পথে যাওয়া, শারীরিক অসুস্থতা বা দুর্বলতা, পরিবেশগত চাপ বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
ভিডিওটি নতুন করে ভাইরাল হওয়ার কারণ কেবল দৃশ্যটি নয়, বরং সময়টিও। বর্তমান বিশ্বে মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত, অনিশ্চিত ও চাপগ্রস্ত। কাজ, সম্পর্ক, রাজনীতি, অর্থনীতি—সব মিলিয়ে অনেকেই নিজেকে আটকে পড়া মনে করছেন। ঠিক এই জায়গায় একা হাঁটা পেঙ্গুইনটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের প্রতীক।
অনেকে বলছেন, এটি যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তির দৃশ্যরূপ—‘যদি তোর ডাক শুনে না আসে, তবে একলা চলো রে।’
কেউ এটিকে জীবনের অর্থ খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন সমাজের বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার সাহস হিসেবে। আবার অনেকেই একে নিছক মজার মিম হিসেবেই নিচ্ছেন।
নিহিলিজম দর্শনে জীবনের কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই—এই ধারণাই মুখ্য। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই মজা করে বলছেন, এই পেঙ্গুইন জীবনের অর্থ খুঁজে পায়নি বলেই সব ছেড়ে একা হাঁটছে।
এই ব্যাখ্যা হাস্যরসাত্মক হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের নিজের অনুভূতি। অনেক ইউজার পেঙ্গুইনের যাত্রার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন নিজেদের—মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমাজের প্রত্যাশা থেকে পালানোর ইচ্ছাকে।
এ কারণেই একটি পুরোনো ডকুমেন্টারির দৃশ্য নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলছেন—পেঙ্গুইন মানুষের মতো চিন্তা করে না। এটি কোনো বিদ্রোহ বা দর্শনের পথে হাঁটছে না। বরং এ ধরনের আচরণ পেঙ্গুইনের টিকে থাকার জন্য মারাত্মক হুমকি।
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে রাজনৈতিক ব্যঙ্গও যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি এআই-নির্মিত ছবি পোস্ট করা হয়, যেখানে দেখা যায় পেঙ্গুইনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাঁটছে। পেঙ্গুইনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা, সামনে বরফে উড়ছে গ্রিনল্যান্ডের পতাকা। ওই পোস্ট ঘিরে ব্যাপক ট্রল ও সমালোচনা শুরু হয়।
কারণ গ্রিনল্যান্ডে পেঙ্গুইনের অস্তিত্বই নেই। এটি এক ধরনের উড়তে না-পারা জলচর পাখি। মূলত পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে বসবাস করে। অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চলে পেঙ্গুইনের দেখা পাওয়া যায়। এরা উড়তে না পারলেও পানির নিচে অসাধারণ দক্ষ সাঁতারু। পেঙ্গুইনের ডানা পাখনার মতো শক্ত ফ্লিপারে রূপান্তরিত হওয়ায় তারা দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে পারে এবং গভীর সমুদ্রে ডুব দিতে সক্ষম।
পেঙ্গুইনের শরীর ঘন পালক ও পুরু চর্বির স্তরে আবৃত, যা তাদের প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে এম্পেরর পেঙ্গুইন –৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও টিকে থাকতে পারে। ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তারা দল বেঁধে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকে, যাকে হাডলিং বলা হয়। পেঙ্গুইনের কালো-সাদা রঙ শিকারি থেকে আত্মরক্ষার একটি কৌশল; পানির ওপর থেকে দেখলে কালো অংশ সমুদ্রের গভীরতার সঙ্গে মিশে যায় এবং নিচ থেকে দেখলে সাদা অংশ আকাশের আলোয় মিশে যায়।
পেঙ্গুইন সাধারণত মাছ, স্কুইড ও ক্রিল খেয়ে থাকে। এদের মধ্যে অনেক প্রজাতি একসঙ্গী-প্রাণী এবং আজীবন একই সঙ্গীর সঙ্গে বসবাস করে। এম্পেরর পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রে ডিমে তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে পুরুষ পেঙ্গুইন, যা প্রাণিজগতে ব্যতিক্রমী উদাহরণ। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও বরফ গলার কারণে অনেক পেঙ্গুইন প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে