Views Bangladesh Logo

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: বাংলাদেশের স্বার্থে কেন জরুরি?

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-মরণের সাথে জড়িয়ে আছে তিস্তা প্রকল্প।ভারতের গজলডোবা বাঁধের প্রভাবে সংকটে পড়া তিস্তা নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশের এই মেগা প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিস্তা সংকটের সূত্রপাত


তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিম রাজ্যে। প্রায় ৪০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর ২৯০ কিলোমিটার ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, আর বাকি ১১৫ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। নদীটি লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

তিস্তার উৎপত্তিস্থল সিকিম এক সময় ব্রিটিশ ভারতের একটি করদ রাজ্য ছিল, যা ব্রিটিশদের সরাসরি শাসনে না থেকে বার্ষিক কর পরিশোধের বিনিময়ে দেশীয় রাজার অধীনে পরিচালিত হতো। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় সিকিম কার্যত একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৬ই মে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে সিকিমকে তাদের ২২তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিকিম যতদিন ভারতের অঙ্গরাজ্য ছিল না, ততদিন তিস্তার পানি নিয়ে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। ১৯৯৮ সালে ভারত সরকার তিস্তার উজানে নির্মিত গজলডোবা বাঁধ চালু করে পানি প্রত্যাহার শুরু করলে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ওপর এক বিরাট বিপর্যয় নেমে আসে। এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শুধু তীব্র পানি সংকটই তৈরি হয়নি, বরং সামগ্রিক পরিবেশ, প্রকৃতি ও জনজীবনে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, যার ফলে গ্রীষ্মে শুরু হয় তীব্র পানিহীনতা আর বর্ষায় দেখা দেয় প্রলয়ংকরী নদীভাঙন। এতে নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা ও বসতি চরম হুমকিতে পড়েছে এবং প্রয়োজনের সময় পানির তীব্র সংকট থাকায় কৃষির উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মানুষের দারিদ্র্যের হার দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশ অংশের ১১৫ কিলোমিটার তিস্তা নদীর মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার এলাকাই চরম ভাঙনপ্রবণ, যার মধ্যে প্রায় ২০ কিলোমিটারের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা অংশে প্রতিবছরই টানা নদীভাঙন দেখা দেয়; এছাড়া লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন অংশেও নিয়মিত ভাঙন ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাঙন প্রতিরোধে কোনো স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই নদীভাঙন রোধ, আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাব মেটাতে এই নদী-নির্ভর বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়ে আসছে, যা নদীটিতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে আকস্মিক বন্যা ও তীব্র ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কী রয়েছে? 


এই তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রকৃত নাম হলো ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বা বাংলায় 'তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প'। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর গভীরতা বাড়াতে এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে ১০২ কিলোমিটার ব্যাপী নদী ড্রেজিং বা খনন করা হবে, যা নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে বর্ষায় বন্যার পানিতে নদী-তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ আর প্লাবিত হবে না এবং বিশাল চওড়া নদীটিকে শাসন করে একটি নির্দিষ্ট ও সুসংহত মূল চ্যানেলে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমের তীব্র পানি সংকট মেটাতে নদীতে বড় বড় জলাধার বা রিজার্ভার তৈরি করা হবে, যা বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি জমা রেখে শীতকালে কৃষকদের সেচকাজে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেবে।

এই মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে নদীটির চারপাশের এলাকায় বিলীন হয়ে যাওয়া ১৭১ বর্গকিলোমিটার মহামূল্যবান ভূমি উদ্ধার করা হবে এবং সেখানকার বালু সরিয়ে সেগুলোকে উর্বর কৃষিজমিতে পরিণত করা হবে। একই সাথে এই উদ্ধার হওয়া বিশাল জমিতে পরিকল্পিত আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন, শিল্পকারখানা ও ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হবে। এছাড়া নদীর তীরের দুই পাশে মোট ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে, যা নদীভাঙন চিরতরে বন্ধ করবে। এই বাঁধের দুই পাশে সমুদ্র সৈকতের মতো আকর্ষণীয় মেরিন ড্রাইভ যোগাযোগ সড়ক নির্মিত হবে এবং নদীর দুই পাড়ে আধুনিক পরিকল্পিত একাধিক স্যাটেলাইট শহরের পাশাপাশি নদী বন্দর ও বিভিন্ন স্থানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে থাকবে আধুনিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ। আর এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় নদীর দুই পাড়ে নতুন থানা, কোস্টগার্ড ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। তবে এসব কিছুর ঊর্ধ্বে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় যে সুফল পাওয়া যাবে তা হলো— নদীটি সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার হবে, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ হবে, বন্যার ঝুঁকি কমে আসবে এবং মূল নদীতে পানি প্রবাহ ফিরে আসার মাধ্যমে সামগ্রিক পানি সংকটের সমাধানসহ এর শাখানদীগুলোর নাব্যতাও রক্ষা পাবে।

দীর্ঘ অচলাবস্থার পর অগ্রগতির পথে


তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ইতিহাস এবং এর সর্বশেষ অগ্রগতির দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধুমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এই মেগা প্রকল্পটি এতদিন আটকে ছিল। ২০১৬ সালে প্রাথমিক সমীক্ষা শুরুর মধ্য দিয়ে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এটি বাস্তবায়নে চীন ও ভারত—দুই দেশই বিভিন্ন সময়ে তীব্র আগ্রহ দেখায়। তবে কৌশলগত কারণে ভারত এক প্রকার নাছোড়বান্দা হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব বিনয় কোয়েত্রা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগের প্রবল আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও চেয়েছিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে ভারতই যেন এই প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর থেকে ফিরে এসে ২০২৪ সালের ১৪ই জুলাই গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, "চীন এই প্রকল্পের জন্য প্রস্তুত থাকলেও তিনি চান ভারতই এটি করে দিক এবং এই প্রজেক্টের জন্য যা প্রয়োজন ভারত তা দিতে থাকবে।" তবে ওই বিতর্কিত সংবাদ সম্মেলনের মাত্র ৩ সপ্তাহ পর এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

পরবর্তীতে দেশের হাল ধরেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের মার্চে প্রফেসর ইউনূস চীন সফরের পর এই থমকে থাকা প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিতে জোরালো আর্থিক কার্যক্রম শুরু করেন। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের পর্যায়ের কাজ এগিয়ে নিতে চীনের কাছে প্রায় ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয় এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি দ্রুত আর্থিক চুক্তি সই করার আলোচনা শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ২০২৫ সালের ৫ই জুলাই সংবাদ মাধ্যমকে জানান, "তিস্তা প্রকল্প চীনের ঋণে বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে এবং চীনও এই প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করতে চায়, যার ফলে দুই পক্ষের সম্মতিতেই বিষয়টি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত করার মূল কাজটি চলছে, যা শেষ হলে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও আর্থিক চুক্তির প্রক্রিয়া একসঙ্গে সম্পন্ন করা হবে।" *( সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৫)।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৬ সালে শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পের বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ শেষ হওয়ার কথা জানায়, যা সম্পন্ন করেছে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান 'পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না। চীনের এই প্রতিষ্ঠানটিই মূলত এ ধরনের বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের পরিকল্পনা, নির্মাণ ও সরাসরি বিনিয়োগের কাজ করে থাকে।

এরপর ২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক চীন সফরে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পের এক বড় অগ্রগতি সাধিত হয়। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পৃথক দুটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সাথে চীনা প্রেসিডেন্টের একান্তে আরেকটি বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। ওই সফরে ২৫ জুন বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি ছিল নদী ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত। এই চুক্তির অধীনে চীন সরকার ‘তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন ও কারিগরি সহায়তার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়।

এছাড়া, দুই দেশের ১৬ দফার যৌথ ঘোষণাপত্রে বেইজিং স্পষ্ট করে যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল তিস্তা প্রকল্পের যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাই এবং চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে একমত পোষণ করে। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করার চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দিকে চূড়ান্তভাবে অগ্রসর হচ্ছে।

তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভারত প্রসঙ্গ


চীনের সহযোগিতায় এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা অগ্রসর হতে দেখে ভারতীয় গণমাধ্যমে এক ধরনের প্রচারণা চলছে। বাংলাদেশের এই নিরেট অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পটিকে তারা সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আবহ তৈরি করে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, ২০১৭ সালে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সাড়ে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণদান এবং কাজ সম্পন্ন করার সেই চুক্তিটি। দীর্ঘ আট বছরেও সেই চুক্তির প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করা তো দূরের কথা, অধিকাংশ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে কাজই শুরু হয়নি। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও, আজ পর্যন্ত একমাত্র গঙ্গা চুক্তিটিই কোনোক্রমে স্বাক্ষরিত হতে পেরেছে, যা মূলত বাংলাদেশের ব্যাপক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সম্পাদিত হয়েছিল।

এরপর আর অন্য কোনো নদীর পানি বণ্টন চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিরও আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তা আটকে যায়। পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের আমলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে; বাংলাদেশ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বারবার বিষয়টি তুললেও ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়টি আর এগোয়নি। এ কারনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে তিস্তার পানি সংরক্ষণই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এক্ষত্রে চীনের কারিগরী দক্ষতা বিবেচনা করলে চীনের সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে পারে।

ভারত পানি না দিলেও কি সফল হবে প্রকল্প?


কেউ কেউ একটি প্রশ্ন প্রায়ই তোলেন যে, চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পর ভারত যদি উজানে পুরোপুরি পানি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে এই মেগা প্রজেক্টের সুফল বাংলাদেশ আদৌ ভোগ করতে পারবে কি না? এই সংশয় থেকে অনেকে আবার এমন পরামর্শও দিয়ে থাকেন যে, ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের সমাধান করতে হবে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের প্রশ্ন ও পরামর্শ একেবারেই অমূলক এবং এটি মূলত ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে তৈরি করা একটি সুনির্দিষ্ট প্রোপাগান্ডা ও বয়ান মাত্র। কেননা, যেখানে ভারতের সাথে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিই স্বাক্ষরিত হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তা হওয়ার কোনো আশাও নেই, সেখানে ভারত নতুন করে ‘পানি বন্ধ করে দেবে কি না’—এই প্রসঙ্গটিই সম্পূর্ণ অবান্তর। বাস্তব সত্য হলো, ভারত এমনিতেই এখন শুষ্ক মৌসুমে আমাদের পানি দিচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও দেবে না।

এখানে আসল সমীকরণটি হলো, বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে এখনো প্রচুর পরিমাণ প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাত হয় এবং ভারতও বর্ষাকালে তার বাঁধের সব কপাট খুলে দিয়ে অতিরিক্ত পানির চাপ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং, তিস্তা মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা বর্ষাকালে সংঘটিত বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত এবং ভারতীয় ঢলে আসা সেই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পানি বিশাল জলাধারে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচ ও কৃষিকাজে অতি সহজেই ব্যবহার করা সম্ভব এবং নদীর পানি প্রবাহ ঠিক রাখা সম্ভব।

[জুবায়ের হাসান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক]

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ