Views Bangladesh Logo

বাংলাদেশের জন্য স্যার মার্ক টালি কেন প্রাসঙ্গিক

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

প্রয়াত হলেন বিবিসির 'ভয়েস অব ইন্ডিয়া' খ্যাত সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানের নৃশংসতা নিয়ে সারা বিশ্বকে অবহিত করেন যে ক'জন পশ্চিমা সাংবাদিক, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিচারিতা এবং পাকিস্তানের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের সামনে সত্য তুলে ধরেন তিনি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে তিনি ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। সেই প্রথম এবং শেষ বারের মতো পাকিস্তান সরকার দু’জন সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিল।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন বিবিসিতে নিয়মিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন মার্ক টালি।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিবিসি মানেই ছিল মার্ক টালি। যাদের বাড়িতে তখন রেডিও ছিল, তারা সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে কান পেতে অপেক্ষা করতেন বিবিসিতে তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। তার কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বুকেও। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। 

মার্ক টালি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের সেই সফরে তিনি ঢাকা থেকে সড়ক পথে রাজশাহী গিয়েছিলেন।

এক স্মৃতিচারণায় বলেন, "পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছাল এবং তারা মনে করলো যে পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তখনই তারা আমাদের আসার অনুমতি দিয়েছিল। আমার সাথে তখন ছিলেন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধ বিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।"

বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, "আমরা যেহেতু স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সুযোগ পেয়েছি, সেজন্য আমাদের সংবাদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে সড়কের দু’পাশে দেখেছিলাম যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।"

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা জন্য টালিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০১২ সালে 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' প্রদান করা হয়।

ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন টালি। তার পিতা ব্রিটিশ রাজের নিয়ন্ত্রণাধীন শীর্ষস্থানীয় অংশীদারী প্রতিষ্ঠানের ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ছিলেন। শৈশবের প্রথম দশকে তিনি ভারতে অবস্থান করেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। টাইফোর্ড স্কুল, মার্লবোরো কলেজ এবং ট্রিনিটি হলে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর তিনি ক্যাম্ব্রিজের চার্চ অব ইংল্যান্ডে পাদ্রী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিঙ্কন থিওলোজিক্যাল কলেজে দুই মেয়াদে পড়াশোনার পর এ চিন্তাধারা থেকে বের হয়ে আসেন এবং সাংবাদিকতা করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৬৪ সালে তিনি বিবিসিতে যোগদান করেন। ভারতীয় সংবাদদাতা হিসেবে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে আসেন। দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থানকালীন তার কর্মজীবনে তিনি অনেকগুলো প্রধান প্রধান ঘটনাবলীর সাক্ষী হন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার ও এর ফলশ্রুতিতে সংঘটিত ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতভাবে তিনি কাজ করতেন।

১৯৯৪ সালে মার্ক টালি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন।সহকর্মী জন বার্টের (পরবর্তীতে মহাপরিচালক) সঙ্গে বাদানুবাদই ছিল মূল কারণ। তিনি বার্টকে 'ভীত হয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো' এবং 'বিবিসির নিম্নমূখীতা ও সহকর্মীদেরকে নৈতিকভাবে দুর্বল করা'র দায়ে অভিযুক্ত করেন। এরপর থেকেই তিনি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন।

মার্ক টালি ১৯৮৫ সালে ওবিই পদবীতে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে নতুন বছরের সম্মাননাস্বরূপ নাইট উপাধি লাভ করেন। ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ পদক লাভ করেন।

তিনি ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গ্রন্থ 'অমৃতসর: মিসেস গান্ধী'জ লাস্ট ব্যাটেল' প্রকাশ করেন। তার সহকর্মী ও বিবিসি দিল্লি'র প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকবকে নিয়ে তিনি এ গ্রন্থটি রচনা করেন। বইটিতে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সংঘটিত অপারেশন ব্লু স্টারের ঘটনাবলী

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ