মৃত্যু কেন এত সহজ!
ঘটনা-১
শরীয়তপুরের গোসাইরহাটের আদিবা (৫) জীবনে প্রথম দিন মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছিলেন। গেল ২৯ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে নাগেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুব কাছে একটি অটোরিকশা তাকে চাপা দেয়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানায় আদিবা মারা গেছে। কি সহজ মৃত্যু না!
ঘটনা-২
বাইরে বাবা-মা অপেক্ষা করছে। ভেতরে ছেলের সুন্নতে খাতনা করানো হচ্ছে। একটু বাদেই হয়তো সব শেষ হবে। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। সুন্নতে খাতনা মুসলমানদের কাছে একটি উৎসবের মতো। হয়তো বাড়িতে আরও কেউ কেউ অপেক্ষা করছে। ছেলে বাড়ি ফিরবে। কীভাবে তার যত্ন করবেন মা নিশ্চই সব কিছু ঠিক ঠাক করে রেখেছিলেন; কিন্তু সময় যায়। উৎকণ্ঠা বাড়ে। বাবা বার বার জানতে চান কি হয়েছে। কোনো উত্তর নেই। হাসপাতাল চত্বরে ছোটাছুটি এলোমেলো চলাচল। বাবা অপারেশন থিয়েটারে ঢুকলেন ছেলের বুকের দুপাশে ফুটো করে পাইপ ঢুকানো হয়েছে। সবাই নিশ্চয় আঁচ করতে পারেছেন রাজধানীর মানাদী এভিনিউর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজে শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঠিক আগের ঘটনা এগুলো। কি সহজ মৃত্যু না!
ঘটনা-৩
দীপু সানা (৩৭), বাংলাদেশ ব্যাংকের সদরঘাট অফিসে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। খানিকটা মুটিয়ে যাচ্ছেন তাই বাসায় ফেরার পথে কিছুটা রাস্তা হেঁটে যেতেন। প্রতিদিন সরদরঘাট থেকে শান্তিনগর নেমে হেঁটে মগবাজার বাসায় ফিরছিলেন। গত ১০ জানুয়ারি সন্ধ্যায়ও একই রুট ব্যবহার করছিলেন। মৌচাক মার্কেটের কাছে আসার পর ওপর থেকে তার মাথায় একটি ইট এসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। কি সহজ মৃত্যু না!
এই হচ্ছে গত জানুয়ারি মাসের আলোচিত তিনটি মৃত্যুর ঘটনা। আচ্ছা আমাদের অনেক মানুষ আছে। ১৭ কোটি তাই তো। এর মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যু একটু সহজ হলেই বা কী? বিষয়টি কি এমনই? নাহলে এভাবে এত সহজে আমরা কেন মানুষ হত্যা করছি। নাহলে রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে ওপর থেকে ইট পড়ে কী করে, মায়ের হাত ধরে আদিবার ওপর দিয়ে কীভাবে অটোরিকশা উঠে যায়? কেন? কেন আয়ানের ঘরের খতনার অনুষ্ঠানে নেমে আসে ঘোর অমানিশা!
একটি হিসাব করি চলুন, দেশে মোট বিদ্যুৎচালিত অটোরিশার সংখ্যা কত? কেউ জানেন না এই সংখ্যা কত। কারণ এটি জানার কোনো পথ বা পদ্ধতি সরকারের হাতে নেই। এর প্রধান কারণ হচ্ছে এসব অটোরিকশার কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। অর্থাৎ এমন কোনো কর্তৃপক্ষ নেই, যেখানে এসব অটোরিকশাকে নিবন্ধন নিতে হয়। কোনো কোনো পৌরসভা অটোরিকশার স্বীকৃতি দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে অটোরিকশার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা যার মূল লক্ষ্য। ব্যাটারিচালিত এসব অটোরিকশার বাইরে এখন দেশের সব এলাকা এমনকি ঢাকাতেও যান্ত্রিক রিকশা ও ভ্যান রয়েছে। যেগুলোও মোটরচালিত। দেশে মোটরসাইকেল চালাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগে; কিন্তু এসব অটোরকশা, ভ্যান কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে কোনো ডাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মনেই করে না ব্যাটারিচালিত এসব যান কোনো যানবাহন। ফলে এদের দায়িত্ব তারা নিতে চান না। বিআরটিএ বারবার সরকারকে বলেছে মানের দিক থেকে এগুলো উত্তীর্ণ হতে পারছে না। বিশেষ করে এইসব যানবাহনের ব্রেকিং সিস্টেম যথেষ্ট কার্যকর নয়। যাতে নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এবার বলুন যে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন, তার চালকও যদি হয় নিয়ন্ত্রণহীন, তাহলে রোজ একজন করে আদিবা যে মরছে না, এটিই আমাদের পরম পাওয়া নয়? আমাদের দেশের বাস চালায় হেলপার। দুর্ঘটনার পরপর পত্রিকায় বড় বড় করে খবর ছাপা হয় বাসটি তখন চালাচ্ছিলেন হেলপার। সেখানে এ ধরনের গাড়ি কে চালাল, কে না চালাল তার খবর আর কেউবা রাখে। কিন্তু রাখাতো উচিত। যেহেতু এ ধরনের পরিবহন এখন আমাদের দৈনন্দিক জীবনের জন্য এক ধরনের বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। আমরা চাইলেও এগুলো বন্ধ করতে পারছি না; কিন্তু নিয়ন্ত্রণতো করা যায়। নিদেন পক্ষে চালককে তো একটা লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। কোথাও একটু একমাস দুমাসের প্রশিক্ষাণের কি ব্যবস্থা করা যায় না। আর সব ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ সরকারি হতে হবে কেন। বেসরকারিভাবে কোনোরকম সরকারি খরচ ছাড়াওতো ব্যবস্থা করা যায়। তাহলে হয়তো মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া আদিবাকে গোরস্তানে যেতে হবে না।
খতনার সময় বাড়িতে একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকে। আগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে এক শ্রেণির মানুষ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খতনা করাত। এরপর চিকিৎসকরা বলল না এই পদ্ধতি সুবিধাজনক নয়। এই দায়িত্ব আমরা নেব। চিকিৎসকরা খতনার দায়িত্ব নেয়ার পর একটু একটু করে সংস্কার করতে শুরু করল। শুরুতে কেবল অবশ করেই কাজটি সারা হতো। এরপর তারা বলল আধা অ্যানেস্থেশিয়া, ফুল অ্যানেস্থেশিয়া এসব করতে হবে। এভাবে ধাপ যত বাড়ল টাকার অঙ্ক তত বাড়ল। কোনো কোনো জায়গায় নাকি ১ লাখ ২০ হাজার টাকাও লাগে। ভাবুন একবার! ১ হাজার টাকার কাজ ১ লাখ ২০ হাজার নিচ্ছে তারপরও জীবনের নিশ্চয়তা কোথায়? ফুল অ্যানেস্থেশিয়া দিলে সব সময় জ্ঞান ফিরবে এমনটি নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকরা খতনার আগে অভিভাবকের কাছ থেকে বন্ড সাইন নেন মরলে কিছু জানি না। কি আজব না?
শিশু আয়ানের মৃত্যু নিয়ে যা হচ্ছে তা কি হওয়ার কথা। আচ্ছা আয়ানের মৃত্যুর পর তদন্ত প্রতিবেদনে দোষীদের দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার বাবাকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দেয়া হচ্ছে। কি আশ্চর্য সমাজ না!
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শিশুটির ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ছিল। এজন্য তাকে স্টেরয়েড দেয়া হয়েছিল। উচ্চ আদালতে শুনানিতে মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, ‘আমরা চিকিৎসক না, কিন্তু মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্স পড়েছি। বোঝাই যাচ্ছে যে আপনাদের (সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের) অবহেলা ছিল। (আয়ানের) কোনো সুরতহাল না করেই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তার খতনা করাতে গিয়ে এত বেশি পরিমাণ ওষুধ ব্যবহৃত করা হয়েছে, সেটা সাধারণত বাইপাস সার্জারির জন্য প্রয়োজন হয় না। তার ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমার সমস্যা আছে জানার পরও চিকিৎসকরা কেন এত তাড়াহুড়ো করে তার খতনা করালেন? তারা কিছু দিন অপেক্ষা করতে পারতেন। আদালত তদন্ত প্রতিবেদনটি হাস্যকর। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। শিশু আয়ানের পরিবার শেষ পর্যন্ত বিচার পাবেন কি না কেউ জানেন না। তবে এই দেশে এমন অবিচারের বিচার খুব একটা হতে দেখা যায় না।
রাস্তায় গাড়িতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এটা অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই সবাই নিচ্ছেন। রাস্তায় নামলে বেঁচে ফিরতেও পারেন আবার নাও ফিরতে পারেন। গত ডিসেম্বর মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫১৭টি। নিহত ৫১২ জন এবং আহত ৭৯৩ জন। কিন্তু ফুটপাথ দিয়ে দীপু সানারা হেঁটে বাড়ি যেতে পারবেন না, এটা খুব বাড়াবাড়ি রকমের অন্যায়। তাহলে আমরা কি প্রতিদিন মৃত্যুর পথ ধরেই হাঁটবো? যে মৃত্যু ভীষণ নির্মম কিন্তু খুব সহজ।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে