বিএনপি কেন পিআরের বিরুদ্ধে?
পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে বিএনপি হেরে যাবে আর জামায়াত ক্ষমতায় আসবে- এরকম ধারণা হয়তো অনেকের মনে আছে। সত্যি কি তা-ই এবং বিএনপি কি এ কারণেই পিআর পদ্ধতির বিরোধী?
পিআর শব্দটি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সরগরম রাজনীতির মাঠ। বিশেষ করে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পিআর পদ্ধতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে সবচেয়ে বেশি সরব। জাতীয় নাগরিক-এনসিপিও পিআরের পক্ষে, তবে সেটি সংসদের উচ্চকক্ষে। অবশ্য তাদের আলোচনায় যতটা না নির্বাচন, তার চেয়ে বেশি বিচার, সংস্কার ও জুলাই সনদ। আর নির্বাচন বলতে তাদের দাবি গণপরিষদ নির্বাচন। ফলে তাদের সঙ্গে দেশে এ মুহূর্তে সক্রিয় অন্য দলগুলোর অবস্থানের পার্থক্য অনেক।
আসা যাক, পিআর প্রসঙ্গে। এটি মূলত এক ধরনের ভোটিং সিস্টেম বা নির্বাচনি ব্যবস্থা। পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশেই এই পদ্ধতিতে ভোট হয়। তাহলে বাংলাদেশ কেন নয় এবং যদি ইউরোপের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় এই পদ্ধতিতে ভোট হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে এই পদ্ধতিতে নির্বাচন করতে কী অসুবিধা- এরকম প্রশ্নও জনমনে আছে। বিশেষ করে যারা পিআরের পক্ষে, তারা এ প্রশ্নগুলো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পিআর কী
বাংলাদেশে এখন যে পদ্ধতিতে ভোট হয় বা ভোটাররা এখন যেভাবে জাতীয় নির্বাচনে তাদের প্রত্যেকের আসনে একটি নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দেন, তাতে ভোট গণনা শেষে যিনি সবার চেয়ে বেশি ভোট পান, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কেউ বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে মাত্র এক ভোট কম পেলেও তিনি পরাজিত বলে গণ্য হন। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি)’। অর্থাৎ যিনি বেশি ভোট পাবেন তিনিই জয়ী এবং বাকি সবাই পরাজিত। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এই পদ্ধতিতে ভোট হয় এবং এটিকেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
পিআর মানে প্রোপোরশোনেট রিপ্রেজেনটেশন। অর্থাৎ আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন। ধরা যাক বাংলাদেশে ১২ কোটি ভোটার। নির্বাচনে ৮ কোটি ভোটার ভোট দিলেন। প্রত্যেকটি দল আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিলো। প্রথমে সব ভোট গণনা করা হবে। এরপর প্রতিটি দলের ভোট একত্র করে দেখা হবে সেটি মোট ভোটের কত শতাংশ। অর্থাৎ এখানে কোন আসন থেকে কোন প্রার্থী জয়ী হলেন, সেটা হিসাব করা হবে না। ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকেও ভোট দেবেন না। তারা ভোট দেবেন মার্কায় (প্রতীকে)। গণনায় যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে অনুপাতে সংসদের ৩০০ আসন বণ্টন করা হবে।
কীভাবে আসন বণ্টন
ধরা যাক বিএনপি ৩০ শতাংশ ভোট পেলো, তাহলে তারা ৩০০ আসনের মধ্যে পাবে ৯০টি। জামায়াত যদি ২০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা আসন পাবে ৬০টি। এনসিপি যদি ১০ শতাংশ ভোট পায় তাহলে তারা আসন পাবে ৩০টি। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যে সিস্টেমে ভোট হয়, তাতে এককভাবে অংশ নিয়ে এনসিপি ৩০টি আসন পাবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বেশ বড় দল; কিন্তু এককভাবে নির্বাচন করে তারা সর্বোচ্চ কতটি আসন পাবে, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
হয়তো অনেক আসনেই তারা অনেক ভোট পাবে; কিন্তু অধিকাংশ আসনেই দেখা যাবে, তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে কিছু ভোট কম পেয়ে হেরে গেছেন। মূলত এ কারণেই তারা পিআরের পক্ষে। কেননা পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে প্রতিটি ভোটই মূল্যবান। তাদের প্রার্থীরা সারা দেশে যে ভোট পাবেন, সেটিকে মোট ভোট থেকে ভাগ করে যদি দেখা যায় যে, তাদের ভোটের সংখ্যা ১২ শতাংশ, তাহলে সংসদে তাদের আসনসংখ্যা হবে ৩৬; কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩৬টি আসন পাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে।
কোয়ালিশন সরকার?
রাজনীতিতে এরকম একটা গুঞ্জন আছে যে, পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপির কোয়ালিশন সরকার হবে। অর্থাৎ এই তিনটি দল যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বিএনপি যদি সরকার গঠনের জন্য কমপেক্ষ ৫১ শতাংশ আসন না পায়, তাহলে সংখ্যার হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটি অন্য আরও কয়েকটি দল মিলে সরকার গঠন করবে। ধরা যাক বিএনপি পেলো ৪০ শতাংশ ভোট; কিন্তু জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপি মিলে ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে গেল- তখন বিএনপিকে থাকতে হবে বিরোধী দলে। কেননা বিএনপির সঙ্গে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপির যে ঐক্য হবে না, সেটি এখন পর্যন্ত পরিষ্কার। যদিও রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
আওয়ামী লীগের ভোট কারা পাবে
দ্বিতীয় অঙ্ক হলো, আগামী নির্বাচনে যদি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারে, তাহলে তাদের ভোট কোথায় যাবে? আওয়ামী লীগের ভোটাররা বাড়িতে বসে থাকবেন নাকি তারা জাতীয় পার্টিকে ভোট দেবেন? জাতীয় পার্টিতে সম্প্রতি আরেকটি ভাঙন হয়েছে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে প্রধান করে দলের একটি নতুন অংশ তৈরি হয়েছে। যদি জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশ নির্বাচনে অংশ নিতে নাও পারে, তাহলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের অংশটি কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে? যদি তাই হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কি জাতীয় পার্টির ওই অংশকে ভোট দেবেন? সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোট মিলে যদি ৩০ শতাংশ হয়ে যায়, তাহলে সংসদে তারা আসন পাবে ৯০টি। তখন অবস্থা কী দাঁড়াবে?
যদি বিএনপি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায় এবং জাতীয় পার্টি ৩০ শতাংশ, তাহলে বিএনপি সরকার গঠন করবে আর জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে। তখন জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দল এবং এনসিপির কী হবে? কোনো দলের এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়াই পিআরের মূল চ্যালেঞ্জ। আর কোনো দল এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে তাদেরকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হয়। তখন শুরু হয় দর কষাকষি। অনেক সময় সংসদ গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটিই জটিলতায় পড়ে যায়। সরকার অস্থিতিশীল হয়ে যায়।
ইউরোপে হলে বাংলাদেশে কেন নয়?
বিশ্বের অনেক দেশে পিআর পদ্ধতিতে ভোট হয়। যেমন জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ইতালি, দক্ষিণ আফ্রিকা। ইসরায়েলেও এই পদ্ধতিতে ভোট হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও নেপালে; এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস, পূর্ব তিমুরে; দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, উরুগুয়েসহ আরও একাধিক দেশে এই পদ্ধতিতে ভোট হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা ও ভারতের মতো দেশে পিআরে ভোট হয় না। সেখানে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোট ব্যবস্থা চালু আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে পদ্ধতিতে ভোট হয়।
প্রশ্ন হলো, ইউরোপের উন্নত দেশে পিআরে ভোট হলে বাংলাদেশে কেন নয়? এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ উল্লেখ করা যায়-
১. পিআর পদ্ধতির একটা বড় সমস্যা হলো, ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে ভোট দেয় না। ভোট দিতে হয় মার্কায়। অর্থাৎ ভোটার জানবে না তার প্রার্থী কে এবং নির্বাচনের পরে তার আসনে কে এমপি হবেন, সেটিও ভোটারের আগে থেকে জানার সুযোগ নেই। কেননা দলগুলো ভোটের আগে নির্বাচনে ৩০০ প্রার্থীর তালিকা দেবে। যে দল যত আসন পাবে, সেই অনুযায়ী এমপিরা সংসদে যাবেন। দলগুলো এই তিনশ প্রার্থীর ক্রম ঠিক করবে কীভাবে, কীসের ভিত্তিতে বা কোন মানদণ্ড বিবেচনায়- এটি একটি বড় প্রশ্ন।
২. পিআর পদ্ধতির একটি বড় সমস্যা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই পদ্ধতিতে নির্বাচনের সুযোগ পান না। সবাইকে কোনো না কোনো দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হয়। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে ভোটারটা ভোট দেন দলকে, ব্যক্তিকে নয়। তবে কিছু দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একটি ‘একক তালিকা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারা নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পেলে সংসদে আসন পায়। তবে এটি জটিল।
৩. এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা। কোনো দল যদি এককভাবে ৫০ শতাংশ ভোট না পায়, তখন তাকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হয়। যদি কোনো দল সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন না পায়, তাহলে বড় দলগুলো ছোট দলগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ- যেখানের রাজনীতি অত্যন্ত জটিল। ফলে এরকম একটি জটিল রাজনৈতিক পরিবেশে পিআর কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
৪. সংসদ সদস্যদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভিন্ন। এখানে আইন প্রণয়নের বাইরেও এমপিরা স্থানীয় উন্ননয়ন কর্মকাণ্ডসহ নানা কাজে যুক্ত থাকেন। তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। দেশের অধিকাংশ মানুষই সম্ভবত এটা বিশ্বাস করে না যে, তার আসনের এমপি শুধু সংসদে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেই যুক্ত থাকবেন। বরং ভোটাররা তাদের দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে এমপিকে কাছে পেতে চায়। যে কারণে সংসদ নির্বাচনে প্রতীকের বাইরেও ব্যক্তির ইমেজ, তার পারিবারিক পরিচিতি এবং সামাজিকভাবে তার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এসব বিবেচনায় রাখে; কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে ভোটাররা জানবে না ভোটের পরে তার আসনে কে এমপি হবেন বা তার এলাকা থেকে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাদের মধ্যে কে কে বা কতজন সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তার মানে জনপ্রতিনিধির সঙ্গে ভোটারের যে সম্পর্ক- সেটি এই পদ্ধতিতে গড়ে ওঠে না।
৫. ইউরোপের উন্নত দেশগুলোয় স্থানীয় সরকার কাঠামোটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে নাগরিকদের যে কোনো প্রয়োজনে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়। তাছাড়া নাগরিকদের উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিতে সব আয়োজন রাষ্ট্রই সম্পন্ন করে। ফলে কার আসনে কে সংসদ সদস্য, সেটি ভাববার কোনো প্রয়োজন তাদের হয় না; কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা একেবারেই উল্টো।
পরিশেষে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা নির্বাচনি ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে প্রথমত, প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য, দ্বিতীয়ত, এই সিদ্ধান্তটি আসতে হবে সংসদে আলোচনার মধ্য দিয়ে। এ মুহূর্তে সেটির কোনো সুযোগ নেই। অতএব, পিআর পদ্ধতির দাবির পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আগামী দিনের রাজনীতির মাঠ আরও কতটা উত্তপ্ত হবে এবং এ ধরনের ইস্যু তৈরি করে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনিশ্চিত করে তোলার কোনো এজেন্ডা কারও আছে কি না- সেই সন্দেহও অমূলক নয়।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে