চুলকানি কমেছে মানেই সেরে যায়নি; বর্ষায় ছত্রাকের ফাঁদ থেকে রক্ষার উপায়
শ্রাবণের এই সময়টায় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে রোগীর ভিড় বাড়ে। অভিযোগও প্রায় একই রকম—কুঁচকিতে, বগলে বা পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি; গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়া লালচে দাগ; রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো অস্বস্তি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি ছত্রাকের সংক্রমণ, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী চেম্বারে আসেন সপ্তাহ দুয়েক দেরিতে—মাঝের সময়টা কেটে যায় ফার্মেসি থেকে কেনা একটি মলমের ভরসায়।
সেই মলমটিই এই মৌসুমের সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
তবে তার আগে বোঝা দরকার, বর্ষায় সমস্যাটা বাড়ে কেন। ছত্রাক জন্মাতে ও বংশবিস্তার করতে যা যা দরকার—উষ্ণতা, আর্দ্রতা আর অন্ধকার—বর্ষাকাল ঠিক সেই পরিবেশটিই তৈরি করে দেয়। ভ্যাপসা গরমে ঘাম হয় বেশি, ঘাম শুকায় দেরিতে। বৃষ্টিতে ভেজা কাপড় বা জুতা-মোজা দীর্ঘক্ষণ শরীরে থেকে যায়। শরীরের ভাঁজে—কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচে, পায়ের আঙুলের ফাঁকে—আর্দ্রতা জমে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছত্রাকের জন্য এর চেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি আর হয় না।
এই মৌসুমে সবচেয়ে পরিচিত সংক্রমণটি দাদ, চিকিৎসাশাস্ত্রে যাকে বলে ডার্মাটোফাইটোসিস বা টিনিয়া। এর চেহারা চেনা সহজ: ত্বকে গোলাকার বা চাকতির মতো লালচে দাগ, দাগের কিনারা কিছুটা উঁচু, সেখানে ছোট ছোট গুটি বা ফুসকুড়ি, আর আক্রান্ত জায়গায় তীব্র চুলকানি। দাদ হতে পারে মাথার ত্বকে, হাতে-পায়ে, কুঁচকিতে, এমনকি নখেও। এ ছাড়া বর্ষায় বাড়ে ছুলিসহ আরও কয়েক ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, দাদ ছোঁয়াচে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে তো বটেই, একই তোয়ালে, একই পোশাক, এমনকি একই বিছানার চাদর ব্যবহার করলেও তা ছড়াতে পারে। পোষা প্রাণী থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। ফলে ঘরে একজনের হলে বাকিদেরও ঝুঁকি থাকে—এই সহজ কথাটি অনেক পরিবারই খেয়াল করে না।
এবার সেই মলমের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। চুলকানি শুরু হলে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ক্রিম কিনে লাগানোর চল আমাদের এখানে খুব সাধারণ। সমস্যা হলো, এসব ক্রিমের অনেকগুলোতেই থাকে স্টেরয়েড। স্টেরয়েড প্রদাহ কমায়, তাই লাগানোর দু-এক দিনের মধ্যেই চুলকানি কমে যায়, লালচে ভাবও ফিকে হয়ে আসে। ব্যবহারকারী স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন, সেরে যাচ্ছে।
কিন্তু ছত্রাক মরেনি। স্টেরয়েড কেবল শরীরের প্রতিরোধ-প্রতিক্রিয়াটিকে চাপা দিয়ে রেখেছে, আর সেই আড়ালে ছত্রাক নির্বিঘ্নে ছড়াচ্ছে। ফলে যা হয়, চিকিৎসকরা তাকে বলেন রোগের চেহারা বদলে যাওয়া—দাগের সেই চেনা গোল আকৃতি, উঁচু কিনারা, সব ঝাপসা হয়ে যায়। রোগী যখন শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যান, তখন রোগ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, চিকিৎসাও হয় দীর্ঘ ও জটিল।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা প্রেসক্রিপশনহীন স্টেরয়েড ক্রিমের এই ব্যবহারকে বলছেন ‘নীরব বিপদ’। কারণ ক্ষতিটা তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না—বরং প্রথম কয়েক দিন মনে হয় কাজ হচ্ছে।
অবহেলার খেসারত আরও আছে। সংক্রমণ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবারের অন্যরা আক্রান্ত হতে পারেন। নখ বা মাথার ত্বকে ছড়িয়ে গেলে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। আর একবার অসম্পূর্ণ চিকিৎসা হলে রোগ বারবার ফিরে আসার প্রবণতা তৈরি হয়। ‘চুলকানি তো একটু আছে, পরে দেখাব’—এই ভাবনাটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
প্রতিরোধের মূল কথা একটাই: ত্বক শুকনো রাখা। বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফিরে ভেজা কাপড় ও অন্তর্বাস সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলা দরকার, যতই ক্লান্ত লাগুক। গোসলের পর তোয়ালে দিয়ে গা মুছতে হবে ভালোভাবে, বিশেষ করে শরীরের ভাঁজগুলো—কুঁচকি, বগল, পায়ের আঙুলের ফাঁক। ঘামে ভেজা পোশাক দ্বিতীয়বার না পরাই ভালো। আঁটসাঁট পোশাক ও সিনথেটিক কাপড়ের বদলে ঢিলেঢালা সুতির পোশাক এই মৌসুমে অনেক বেশি নিরাপদ।
জুতা-মোজা নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। বৃষ্টিতে ভেজা জুতা পরদিন আধভেজা অবস্থাতেই আবার পরে ফেলা—এটি পায়ের ছত্রাক সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। সম্ভব হলে দুই জোড়া জুতা পালা করে ব্যবহার করা, প্রতিদিন মোজা বদলানো এবং ভেজা জুতা বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শুকাতে দেওয়া জরুরি। বন্ধ আলমারিতে বা খাটের নিচে ভেজা জুতা রাখা সবচেয়ে খারাপ অভ্যাস।
ঘরের ভেতরের আর্দ্রতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বর্ষায় ঘরের বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকে, আর বন্ধ আলমারি ও ট্রাঙ্কে সেই আর্দ্রতা আটকে থাকে। ফলে ভাঁজ করে রাখা কাপড়ে গন্ধ হয়, কখনো ছত্রাকের ছোপ পড়ে। বৃষ্টি থামলে রোদ উঠলে দরজা-জানালা খুলে দেওয়া, মাঝেমধ্যে আলমারি খুলে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া, বিছানার চাদর ও তোয়ালে ঘন ঘন বদলানো—এই সাধারণ কাজগুলোই অনেকটা কাজে দেয়। ঘরে শুকাতে দেওয়া কাপড় পুরোপুরি না শুকিয়ে ভাঁজ করে তুলে রাখলে সমস্যা বাড়ে।
আর সবচেয়ে জরুরি পরামর্শটি সহজ: চুলকানি বা গোল দাগ দেখা দিলে নিজে থেকে ক্রিম কিনে না লাগিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। ছত্রাক সংক্রমণের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, তীব্রতা ও আক্রান্ত জায়গার ওপর—কোথাও শুধু মলমেই চলে, কোথাও মুখে খাওয়ার ওষুধ লাগে, আর কতদিন চালাতে হবে তা-ও ভিন্ন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসক—দুজনেই এই চিকিৎসা দিতে পারেন।
বিশেষ করে দেরি না করাই ভালো, যদি শিশুর মাথার ত্বকে সংক্রমণ দেখা দেয়, শরীরের একাধিক জায়গায় একসঙ্গে ছড়ায়, নখ আক্রান্ত হয়, কিংবা সংক্রমণের সঙ্গে জ্বর থাকে।
বর্ষা আরও কয়েক সপ্তাহ থাকবে। এই সময়টায় ত্বক শুকনো রাখা আর ওষুধের ব্যাপারে ধৈর্য ধরা—এই দুটিই পরের মৌসুম পর্যন্ত ভোগান্তি এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।
মতামত দিন