Views Bangladesh Logo

কেন জিয়া পরিবারের আস্থার নাম ফাতেমা বেগম

Samiul Ibne Hossain

সামিউল হোসেন

ত্যন্ত সংগ্রামী ও সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ফাতেমা বেগম আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ও নেপথ্য সাক্ষী। প্রায় ১৬ বছর ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সাধারণ গৃহকর্মীর পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে উঠেছেন জিয়া পরিবারের আস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ দিন, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডর—নেত্রীর প্রতিটি দুঃসময়ে নিঃশব্দে উপস্থিত থেকে তিনি স্থাপন করেছেন আনুগত্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত। বেগম জিয়ার প্রয়াণের পরও সেই অটুট বিশ্বাসের টানেই বর্তমানে তিনি তাঁর নাতনি জাইমা রহমানের ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করছেন।

​ফাতেমার এই অবিচল আস্থার সাম্প্রতিক এক ঝলক দেখা গেছে গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, দাদি বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে আসেন জাইমা রহমান। গাড়ি থেকে জাইমা যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁর ঠিক পেছনেই দেখা যায় দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সেই ফাতেমা বেগমকে। কবর জিয়ারতকালে পুরো সময় জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

​পারিবারিক সূত্র ও বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের বরাতে জানা গেছে, ফাতেমার দীর্ঘ ১৬ বছরের এই ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিয়েছে জিয়া পরিবার। বর্তমানে তিনি কেবল একজন কর্মী হিসেবে নন, বরং পরিবারের এক নির্ভরযোগ্য সদস্য হিসেবে জাইমা রহমানের ব্যক্তিগত ও প্রাত্যহিক জীবনের দেখভাল করছেন। ফাতেমার থাকা, খাওয়া এবং চিকিৎসার যাবতীয় দায়ভার এখন থেকে জাইমা রহমান ও তাঁর পরিবারই বহন করবে।

​সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফাতেমার এই দীর্ঘ যাত্রার শুরুটা ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও মালেকা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। ২০০৮ সালে এক মর্মান্তিক মোড়ে থমকে যায় তাঁর জীবন; ছেলের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান স্বামী হারুন লাহাড়ি। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দুই সন্তান নিয়ে তিনি ফিরে যান বাবা-মায়ের ঘরে। মুদি দোকানি বাবার স্বল্প আয়ে বড় সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে শেষ পর্যন্ত তাঁদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়।

​২০০৯ সালে এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন ফাতেমা। তবে তিনি প্রথমবার জাতীয়ভাবে নজরে আসেন ২০১৪ সালে বিএনপির 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। ২৯ ডিসেম্বর গুলশানের বাসার সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বালুভর্তি ট্রাকের ব্যারিকেড ও কড়াকড়ির মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন খালেদা জিয়া। পুলিশের চাপে তিনি যখন শরীরের ভার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন ফাতেমা তাঁকে শক্ত হাতে আগলে রেখেছিলেন। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়া সেই দৃশ্যটি আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে।

​ফাতেমার আনুগত্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ২০১৮ সালে। ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। সাজা ঘোষণার পর তাঁকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল অসুস্থ নেত্রীর সেবা নিশ্চিত করতে ফাতেমা বেগম স্বেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন করেন। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে দীর্ঘ ২৫ মাস কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গী ছিলেন তিনি।

​এমনকি ২০২১ সালে করোনা মহামারীর চরম আতঙ্কেও ফাতেমা ছিলেন অবিচল। ওই বছরের এপ্রিলে বেগম খালেদা জিয়া করোনায় আক্রান্ত হলে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁকে দীর্ঘ ৫৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে পুরোটা সময় ছায়ার মতো নেত্রীর সেবা করেন তিনি। কেবল দেশে নয়, লন্ডনে চিকিৎসার সময়ও তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সার্বক্ষণিক ছিলেন।

​রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন এই অকৃত্রিম সঙ্গী। গত ৩১ ডিসেম্বর জিয়া উদ্যানে দাফনের দিনও দেখা গেছে, প্রিয় নেত্রীর নিথর দেহ যখন কবরের দিকে নেওয়া হচ্ছিল, তখন কফিনের সঙ্গে হেঁটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতেমা। বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থানের পর এখন জাইমা রহমানের ছায়াসঙ্গী হিসেবে তাঁর এই বিশ্বস্ত পথচলা অব্যাহত রয়েছে।


লেখক: সামিউল ইবনে হোসেন, প্রদায়ক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ