পরিবার পরিকল্পনার কাজে কেন গতি কম!
বাংলাদেশ জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিগত বছরগুলোতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। তবে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বর্তমানে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন। কারণ স্বাধীনতার পর মোট প্রজনন হার ৬ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও এক যুগ ধরে সূচক একই জায়গায় স্থির। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫১ সালে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২১ কোটি ৮৪ লাখে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা আছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন বলছে, দেশের মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনার কাজে ৯ হাজারের বেশি পদ খালি আছে। অথচ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক এসব পদে লোক নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। প্রায় সারা দেশের গুদামগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে। এগুলো ঠিক সময়ে কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেশের প্রায় অর্ধেক অঞ্চলে স্বাভাবিক প্রসবের সেবাসামগ্রী নেই। তা কেনারও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মানুষ পুরোপুরি সেবা পাচ্ছে না। অভিযোগ আছে, মাঠপর্যায়ে জনবল না থাকা, কাজ যা হচ্ছে তাতে নজরদারি না থাকা, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর স্বল্পতা- এসব কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখানে নেতৃত্বের বড় সংকট চলছে। বহুদিনের জমে থাকা সমস্যা এখন সংকটে পরিণত হয়েছে। তাই পুরো বিষয়টি আদ্যোপান্ত তদন্ত হওয়া দরকার।
‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ এমন মোক্ষম জনপ্রিয় স্লোগান ধারণ করে এদেশে চলছে পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে জনসংখ্যা কি সমস্যা না সম্পদ এ বিতর্ক এখনও আছে। সীমিত ছোট্ট ভূখণ্ডের বাংলাদেশে ভবিষ্যতেও এ চিন্তা চলবে। কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিরাট সঞ্চয়সহ জনগণের জীবনমান ও গড় আয়ু বৃদ্ধি পেলেও একবিংশ শতকের বাংলাদেশ কি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ ও চাহিদা মেটাতে তার আবাদযোগ্য জমি হারাবে না? আমাদের শঙ্কাটা ভেতরে ভেতরে সেখানেই। এদেশে মানুষের মাথার সংখ্যা বাড়ছে। অথচ বাসযোগ্য-চাষযোগ্য জমির আয়তন বাড়ছে না।
কথা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চে দেয়া এক ভাষণের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, ‘একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রত্যেক বৎসর আমাদের ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে তা হলে ২৫/৩০ বৎসরে বাংলার কোনো জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য।’
এমতাবস্থায় বলতে চাই, জনসংখ্যা সীমিত রাখতে দেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে তৃণমূলে টেকসই ও সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তাই এ খাতে বাজেট বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি তৃণমূলে প্রতিটি বাড়ির দ্বারে দ্বারে স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নারী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পৌঁছাতে হবে। এর জন্য লোকবল বৃদ্ধিসহ সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ না করলে দেশের জনসংখ্যা যেমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না, তেমনি নারী ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়বে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে