অন্যের জীবন কেন বেশি সুখী মনে হয়? যা বলছে ‘সোশ্যাল কম্প্যারিজন থিওরি’
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, ঠিক ততটাই অসাধারণ মনে হয় প্রতিবেশীর নতুন গাড়ি কিংবা সহকর্মীর সদ্য পাওয়া পদোন্নতির খবরে। এই অনুভূতি একেবারেই একা কারও নয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, দিনের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ চিন্তাই আমরা ব্যয় করি নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে। এই তুলনার প্রবণতা মানুষের মনস্তত্ত্বের একটি মৌলিক অংশ, যা আধুনিক জীবনের অস্থিরতা নয়, বরং মানবপ্রকৃতির গভীরে প্রোথিত এক পুরনো প্রবৃত্তি।
এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রথম দাঁড় করান মার্কিন মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিংগার, ১৯৫৪ সালে। তার মতে, নিজের সক্ষমতা ও মতামত যাচাইয়ের একটি সহজাত তাড়না মানুষের মধ্যে থাকে, আর যখন কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড হাতের কাছে থাকে না, তখন মানুষ নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করেই নিজের অবস্থান নির্ণয় করে। সহজ কথায়, আমরা কতটা মেধাবী, সুদর্শন কিংবা সফল তা নিরঙ্কুশভাবে জানা সম্ভব নয়; এসব গুণ কেবল অন্যের সঙ্গে তুলনাতেই অর্থবহ হয়ে ওঠে। এই তত্ত্বকে বলা হয় 'সোশ্যাল কম্প্যারিজন থিওরি' বা সামাজিক তুলনা তত্ত্ব।
এই তুলনার দুটি দিক আছে, ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী। যখন আমরা নিজেদের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা কাউকে দেখে নিজের সঙ্গে মেলাই, তাকে বলে ঊর্ধ্বমুখী তুলনা; আর যখন নিজের চেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা কাউকে দেখে খানিকটা স্বস্তি পাই, তা নিম্নমুখী তুলনা। ঊর্ধ্বমুখী তুলনা কখনো কখনো অনুপ্রেরণা জোগায় "সে যদি পারে, আমিও পারব" গোছের অনুভূতি তৈরি করে- কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা জন্ম দেয় অপ্রতুলতা, ঈর্ষা কিংবা হতাশার অনুভূতি। অন্যদিকে নিম্নমুখী তুলনা সাময়িকভাবে আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে তা বিচারমূলক মনোভাব কিংবা আত্মতুষ্টির জন্ম দিতে পারে।
মজার বিষয় হলো, তুলনার ফলাফল সবসময় যৌক্তিক পথে চলে না। একটি ক্লাসিক গবেষণায় দেখা গেছে, অলিম্পিকে রৌপ্যপদক জয়ীদের চেয়ে ব্রোঞ্জপদক জয়ীরা বেশি সুখী থাকেন। কারণ রৌপ্যজয়ী প্রতিযোগী মনোযোগ দেন সোনার পদক হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপে, যা তার সম্ভাব্য নিম্নমুখী তুলনাকে রূপান্তরিত করে ঊর্ধ্বমুখী তুলনায়; আর ব্রোঞ্জজয়ী উপলব্ধি করেন যে তিনি কোনো পদকই না পাওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছেন। অর্থাৎ প্রকৃত অবস্থান নয়, বরং মনের মধ্যে তৈরি হওয়া "যদি এমন হতো" জাতীয় কল্পিত পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের অনুভূতি।
বর্তমান সময়ে এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে মানুষ নিজেদের জীবনের একেবারে বাছাই করা, মেকআপ দেওয়া সংস্করণ তুলে ধরে, ফলে তুলনার প্রবণতা প্রায় সবসময় ঊর্ধ্বমুখী দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং ব্যবহারকারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে অন্যরা তাদের চেয়ে বেশি সুখী ও শ্রেষ্ঠ জীবন যাপন করছেন। সহকর্মীর বিদেশ ভ্রমণের ছবি, বন্ধুর নতুন চাকরির ঘোষণা কিংবা প্রতিবেশীর সাজানো-গোছানো সংসার এসব দেখেই মন খারাপ হয়ে যায়, অথচ সেই মানুষগুলোর নিজস্ব সংগ্রাম, ব্যর্থতা বা ক্লান্তির মুহূর্তগুলো কখনোই পর্দায় ভেসে ওঠে না। ফলে তৈরি হয় বাস্তবতার এক বিকৃত প্রতিচ্ছবি, যেখানে মনে হয় কেবল নিজের জীবনটাই যথেষ্ট নয়।
তবে এই তুলনাপ্রবণতাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলারও উপায় নেই। কিছু তুলনা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, দিতে পারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা জন্ম দেয় অপ্রতুলতা, ঈর্ষা কিংবা বিষণ্নতার অনুভূতি। বিশেষ করে যাদের এই প্রবণতা মন, সম্পর্ক কিংবা কর্মক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে, তাদের জন্য জ্ঞান-আচরণগত থেরাপি (কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি) কার্যকর হতে পারে যা "এর মানে আমি ব্যর্থ" জাতীয় বিকৃত চিন্তাধারা সংশোধনে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত সত্যিটা হলো- তুলনা মানব-মনস্তত্ত্বের কোনো ত্রুটি নয়, বরং এক ধরনের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যে সামাজিক পরিবেশে এই প্রবৃত্তির বিবর্তন ঘটেছিল, বর্তমান তথ্যপ্রবাহের যুগ তার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তাই প্রশ্নটা হয়তো এই নয় যে অন্য কেউ সত্যিই আমার চেয়ে ভালো আছে কিনা বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত, আমি কার জীবনের সঙ্গে, কেন এবং কীভাবে নিজের জীবনকে মেলাচ্ছি।
মতামত দিন