রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়ার কারণ কী
রাতে ঘুম ভেঙে একবার-দুবার প্রস্রাব করতে ওঠা অনেকের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে একাধিকবার ঘুম ভেঙে গেলে এবং এতে ঘুম ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রাতে ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব করার জন্য বারবার জেগে ওঠাকে নকচুরিয়া বলা হয়। এর পেছনে শুধু বেশি পানি পান নয়, মূত্রথলি, কিডনি, হরমোন, হৃদ্যন্ত্র, ডায়াবেটিস কিংবা ঘুমের সমস্যার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
রাতে বারবার প্রস্রাবের সবচেয়ে সহজ কারণ হতে পারে শোবার আগে অতিরিক্ত তরল পান। বিশেষ করে ঘুমের কাছাকাছি সময়ে বেশি পানি, চা-কফি বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করলে রাতে মূত্রের পরিমাণ বাড়তে পারে। অ্যালকোহলও একইভাবে সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হচ্ছে কি না বুঝতে হলে শুধু কতবার বাথরুমে যাচ্ছেন তা নয়, দিনের কোন সময়ে কতটা তরল পান করছেন সেটিও খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে নকচুরিয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। বয়স বাড়লে শরীরে পানি ধরে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন বা ভ্যাসোপ্রেসিনের কার্যকারিতা ও নিঃসরণে পরিবর্তন আসে। এর ফলে রাতে কিডনি বেশি মূত্র তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বয়সের সঙ্গে মূত্রথলির ধারণক্ষমতা ও মূত্রনালির কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে আগের তুলনায় রাতে বেশি বার প্রস্রাবের প্রয়োজন হতে পারে।
ডায়াবেটিসও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে মূত্রের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং তৃষ্ণাও বাড়তে পারে। ফলে দিনে ও রাতে দুসময়েই ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট বড় হয়ে যাওয়া রাতের ঘন ঘন প্রস্রাবের একটি পরিচিত কারণ। বড় হয়ে যাওয়া প্রস্টেট মূত্রনালির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তখন প্রস্রাব শুরু হতে দেরি হওয়া, মূত্রের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া, বারবার প্রস্রাবের বেগ আসা কিংবা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতির পাশাপাশি রাতে বারবার বাথরুমে যেতে হতে পারে।
আবার অতি সক্রিয় মূত্রথলি থাকলেও এমন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূত্রথলি পুরোপুরি ভর্তি হওয়ার আগেই হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের বেগ আসে। কারও কারও সঙ্গে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যাও থাকতে পারে। নারী-পুরুষ উভয়েরই এ সমস্যা হতে পারে।
মূত্রনালির সংক্রমণ হলে প্রস্রাবের পরিমাণ না বাড়লেও বারবার প্রস্রাবের বেগ আসতে পারে। সাধারণত এর সঙ্গে প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা, তলপেটে অস্বস্তি, দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব কিংবা কখনো জ্বরও থাকতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে শুধু পানি কমিয়ে সমস্যাটি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শরীরে পা বা গোড়ালিতে পানি জমে থাকা এবং কিছু হৃদ্যন্ত্রের সমস্যাও রাতে প্রস্রাব বাড়াতে পারে। দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে পায়ের টিস্যুতে জমে থাকা তরল শোবার সময় শরীরের রক্তসঞ্চালনে ফিরে আসে। তখন কিডনি সেই অতিরিক্ত তরল প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতার মতো অবস্থাতেও এমন হতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালির বাধা, মূত্রথলির বিভিন্ন সমস্যা এবং কিছু স্নায়বিক রোগ নকচুরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু ওষুধ, বিশেষ করে মূত্রবর্ধক ওষুধ, প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ায়। তাই কোনো ওষুধ শুরুর পর রাতের প্রস্রাব বেড়ে গেলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে ওষুধের সময় পরিবর্তন বা বিকল্পের বিষয়ে কথা বলা উচিত।
অনেক সময় সমস্যাটি মূত্রথলিতে নয়, ঘুমের মধ্যেও থাকতে পারে। যেমন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুম বারবার ভেঙে যেতে পারে এবং নকচুরিয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙছে; অথচ ঘুমের সমস্যা আগে থেকেই তাকে জাগিয়ে তুলছে।
রাতে বারবার প্রস্রাব হলে প্রথমেই কয়েক দিনের অভ্যাস খেয়াল করা যেতে পারে। শোবার ঠিক আগে অতিরিক্ত তরল পান না করা, সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল কমানো এবং দিনের বেলায় পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের অভ্যাস কাজে লাগতে পারে। যাদের পা ফুলে যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনের কিছু সময় পা উঁচু করে রাখা বা প্রয়োজন হলে অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে পানি এতটা কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয় যে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়।
সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর কতবার প্রস্রাব হচ্ছে, প্রতিবার আনুমানিক কতটা হচ্ছে, কখন ও কতটা তরল পান করছেন, কী ওষুধ খাচ্ছেন এবং অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না—এসব জানতে চান। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিনের ‘ব্লাডার ডায়েরি’ রাখতে বলা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, কিডনির কার্যকারিতা যাচাই কিংবা মূত্রথলি ঠিকমতো খালি হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করা হতে পারে।
তবে প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালা, জ্বর-কাঁপুনি, কোমর বা পাশের ব্যথা, বমি, পা অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের ধারা খুব দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা মূত্রথলি খালি না হওয়ার অনুভূতি থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এসব লক্ষণ কোনো অন্তর্নিহিত রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।
মতামত দিন