Views Bangladesh Logo

শরীর ও মনের ওষুধ নাচ, হাজার বছরের পাগল করা গল্প

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

গানের তালে দুলে ওঠা, হাত-পা ছুঁড়ে ছন্দে গা ভাসানো—নাচ বোধ হয় মানুষের সবচেয়ে পুরোনো আর সবচেয়ে সহজলভ্য আনন্দের নাম। জিমে যাওয়ার সময় নেই, ডায়েট চার্ট মানতে ভালো লাগে না—তবু যদি সুস্থ থাকতে চান, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গান ছেড়ে দিয়ে একটু নেচে নিন। বিজ্ঞান বলছে, এটি স্রেফ বিনোদন নয়, রীতিমতো ওষুধ।

নাচলে কী হয় শরীরে
নাচকে অনেক চিকিৎসক ও গবেষক এখন সরাসরি 'সেরা ওষুধ' বলেই ডাকছেন। কারণ একটাই—এর সুফল ছড়িয়ে পড়ে শরীর ও মন, দুই দিকেই। ঘণ্টাখানেক আনন্দ করে নাচলে গড়ে ৩০০ থেকে ৮০০ ক্যালোরি পর্যন্ত পুড়তে পারে, নির্ভর করে নাচের ধরন আর তীব্রতার ওপর। হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য এটি চমৎকার এক্সারসাইজ, রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতেও সহায়ক—বিশেষ করে বলরুম ধাঁচের নাচে।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রভাবটা পড়ে মস্তিষ্কে। নিউইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নাচ করলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমে যেতে পারে প্রায় ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত—শরীরচর্চার অন্য যেকোনো ধরনের চেয়ে যা ঢের বেশি কার্যকর। কারণ নাচের সময় শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্ককেও একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ সামলাতে হয়—ছন্দ মনে রাখা, পা ফেলার ধরন ঠিক করা, সঙ্গীর সঙ্গে সমন্বয় করা। এই বহুমুখী উদ্দীপনাই মস্তিষ্ককে বাড়তি সচল রাখে।

মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও নাচের গুরুত্ব কম নয়। নাচলে শরীরে নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিনের মতো 'সুখী হরমোন', যা মন খারাপ ও দুশ্চিন্তা অনেকটাই লাঘব করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা মানুষ নন, সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাতেও 'নৃত্য থেরাপি' কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আর সবচেয়ে ভালো খবর হলো, নাচের জন্য বয়সের কোনো বাধা নেই—শিশু থেকে প্রবীণ, সবাই সমানভাবে এর সুফল পেতে পারেন।

বাংলা আর ভারতবর্ষের নাচের সুতো ধরে
নাচের ইতিহাস মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রায় সমান পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের গুহাচিত্রে নাচের ভঙ্গি খোদাই করা আছে প্রায় ৯ হাজার বছর আগে থেকে—বিশ্বের প্রাচীনতম নৃত্য-চিত্রকর্মগুলোর একটি। তখন লিখিত ভাষা ছিল না, তাই পূর্বপুরুষদের গল্প-কিংবদন্তি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দিত এই নাচই।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচিত হয় আরও পরে, ঋষি ভরতমুনির হাতে। তার লেখা 'নাট্যশাস্ত্র' গ্রন্থে অভিনয়, নৃত্য ও সংগীতের যে বিস্তারিত নিয়মকানুন বাঁধা হয়েছিল, আজও তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভরতনাট্যম, কত্থক, কথাকলি, ওডিশি, কুচিপুড়ি, মণিপুরীসহ ভারতের আটটি স্বীকৃত শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা। মজার বিষয়, দক্ষিণ ভারতের ভরতনাট্যম একসময় শুধু মন্দিরে দেবদাসীদের পরিবেশনা ছিল, ষোড়শ শতকে দেবদাসী প্রথা লোপ পাওয়ার পর প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল এই নাচ। বিশ শতকে রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল নামের এক নারীর একরোখা প্রচেষ্টায় আবার তা মঞ্চে ফিরে আসে, নতুন নামও পায়—ভরতনাট্যম।

বাংলার নিজস্ব নাচের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদেই নৃত্যগীতে পারদর্শী 'ডোম্বী'দের উল্লেখ পাওয়া যায়, সঙ্গে একতারা, বীণা, ডমরু, বাঁশি, মাদলের মতো বাদ্যযন্ত্রের কথাও। নবম শতকে রচিত এক চর্যাপদে তো সরাসরি বজ্রাচার্যের নৃত্য পরিবেশনের বর্ণনাও মেলে। তবে বাঙালির নাচকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করানোর কৃতিত্ব মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৯১৯ সালে সিলেটের মাছিমপুরে মণিপুরী নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি ১৯২৬ সালে বিশ্বভারতীর পাঠক্রমে নাচ অন্তর্ভুক্ত করেন, আর নিজে লেখেন 'শ্যামা', 'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা', 'নটীর পূজা'র মতো নৃত্যনাট্য—যা বাঙালির নাচকে দেয় একেবারে নতুন এক শিল্পরূপ।

বিশ্বজুড়ে নাচের নানা রূপ
দুনিয়ার প্রতিটি সংস্কৃতিই নিজের মতো করে নাচকে গড়ে নিয়েছে। আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে সীমান্তের রিও দে লা প্লাতা নদীর তীরের বন্দর এলাকায়, উনবিংশ শতকের শেষ দিকে, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের হাত ধরে জন্ম নেয় ট্যাঙ্গো—যা আজ বিশ্বজুড়ে আবেগ আর নাটকীয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের রোমা জনগোষ্ঠীর হাত ধরে জন্ম নেওয়া ফ্লামেঙ্কো, ব্রাজিলের সাম্বা, ক্যারিবীয় সালসা—প্রতিটি নাচের গল্পই আসলে সেই জাতির সংগ্রাম, উৎসব আর পরিচয়ের গল্প।

ইউরোপেও নাচ নিয়ে কম নাটক হয়নি। আঠারো শতকে ওয়াল্টজকে রীতিমতো 'অশালীন' নাচ বলে গণ্য করা হতো, কারণ নাচের সময় জুটির মধ্যে দূরত্ব থাকত খুবই কম! নেপোলিয়ন বোনাপার্তের অস্ট্রিয়া জয়ের পর ইউরোপীয় মিত্রশক্তিরা যখন বিজয় উদ্‌যাপনে ওয়াল্টজ নাচেন, তখন থেকেই এই নাচের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বদলে যায়।

নাচ নিয়ে কিছু মজার পাগলামি
১৫১৮ সালে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে ঘটেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনাগুলোর একটি—হঠাৎ একদল মানুষ রাস্তায় নেমে নাচতে শুরু করেন, আর থামতেই পারেন না! প্রায় এক মাস ধরে চলা এই 'নৃত্য-মহামারিতে' মারাও যান বেশ কয়েকজন। ঠিক কী কারণে এমনটা হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি রহস্যই থেকে গেছে—কেউ বলেন গণউন্মাদনা, কেউ বলেন বিষাক্ত ছত্রাকযুক্ত শস্য খাওয়ার প্রভাব।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতা উল্টালেও মেলে নাচ নিয়ে মানুষের অদম্য জেদের প্রমাণ। ভারতের মহারাষ্ট্রের কিশোরী স্রুষ্টি সুধীর জগতাপ ২০২৩ সালে একটানা ১২৭ ঘণ্টা নেচে গড়েছেন এক ব্যক্তির সবচেয়ে দীর্ঘ নাচের রেকর্ড, বেশির ভাগ সময় নেচেছেন কত্থক। ইসরায়েলের তেল আবিবে ২০১০ সালে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার নারী অংশ নিয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নাচের ক্লাসে।

নাচ যখন খ্যাতির সিঁড়ি
আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে নাচ হয়ে উঠেছে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ারও এক সহজ পথ। টিকটক বা রিলসে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা বা কোরিওগ্রাফি ভাইরাল হলেই তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, জন্ম নেয় নতুন 'ডান্স চ্যালেঞ্জ'। ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, শুধু অভিনয় বা গান নয়, নিজস্ব নাচের ভঙ্গির জোরেই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন অনেকে—মাইকেল জ্যাকসনের 'মুনওয়াক' থেকে শুরু করে কে-পপ তারকাদের নিখুঁত সিনক্রোনাইজড কোরিওগ্রাফি, সবকিছুই প্রমাণ করে, একটি ভালো নাচের মুদ্রা কখনো কখনো একজন মানুষের পরিচয়টাই বদলে দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত নাচের আসল সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই—শরীর সুস্থ রাখা, মন হালকা করা কিংবা তারকা হয়ে ওঠা, যে কারণেই নাচুন না কেন, সেই কয়েক মিনিটের ছন্দে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দটুকু সবার জন্যই অবারিত।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ