নারী পোশাককর্মীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে বঞ্চিত কেন?
দেশের পোশাকশিল্প নারীর কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত। এ খাতে আইন অনুযায়ী কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গর্ভবতী মায়েদের বেতনসহ চার মাস ছুটি পাওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ আছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়েরা এ ছুটি পান না। বরং নানাভাবে শ্রমিকদের হয়রানি করা হয়। এসব এড়াতে কখনো কখনো শ্রমিকরা বাধ্য হন চাকরি ছেড়ে দিতে। তাই গর্ভধারণের কয়েক মাসের মধ্যে কাজ ছেড়ে দিয়ে যাওয়া শ্রমিক কোনোমতে সন্তান জন্ম দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই নতুন করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। পোশাকশিল্পের মালিকদের এমন আচরণ যেমন শ্রম আইন পরিপন্থী, তেমনই অমানবিক।
এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের (এসিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতিবছর মা হন ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু তাদের মধ্যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পান মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পাওয়া নারী শ্রমিকদের অধিকার। তাই অধিকাংশ নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি পর্যাপ্ত না থাকা এবং প্রসবের পর সন্তানকে কার কাছে রেখে যাবেন, সেটিই তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের ৩ হাজার ২০০-এর বেশি পোশাক কারখানায় কর্মরত ২৫ লাখের বেশি শ্রমিক। এর ১৫ লাখই নারী। তাদের সবাই প্রায় বয়সে তরুণী। আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বলা থাকলেও পোশাক কারখানাগুলোর হাতে গোনা কয়েকটি তা মানে। উল্টো গর্ভধারণ করলে চাকরিচ্যুত করে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো, যদিও প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করতে চান না। সে জন্য চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক কর্মী গর্ভধারণ পিছিয়ে দেন। অনেকে আবার বিলম্বিত বয়সে গর্ভধারণ করতে গিয়ে শারীরিক জটিলতার মধ্যে পড়েন।
আদালত সূত্র বলছে, শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটি আর পাওনা আদায় নিয়ে মামলা ঝুলে আছে ৩৫০টির বেশি। আর রায় হতে সময় নিচ্ছে বছরের পর বছর। তা ছাড়া মাতৃত্বকালীন আইন ভঙ্গের জন্য আলাদা কোনো শাস্তির বিধান নেই। তবে শ্রম আইন ভঙ্গের একটি সার্বিক শাস্তি রয়েছে। আইন ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেলে চাকরিদাতাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিক সন্তান প্রসবের আগে আট সপ্তাহ এবং প্রসবের পরের আট সপ্তাহ, মোট ১৬ সপ্তাহ পূর্ণ মজুরিতে ছুটি পাওয়ার অধিকার রাখেন। মালিক এই ছুটি দিতে বাধ্য। চাকরিতে এ ছুটি ভোগ করা যাবে সর্বোচ্চ দুবার। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট হারে তার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে আর্থিক ভাতা পাবেন। তবে মাতৃত্বকালীন এসব সুবিধা পেতে একজন নারী শ্রমিককে সেই নিয়োগকর্তার অধীনে সন্তান প্রসবের আগে কমপক্ষে ছয় মাস চাকরি করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ আছে, অনেক প্রতিষ্ঠানই কাগজে-কলমে এ ধরনের ছুটিছাঁটা ও ভাতাদি প্রদান দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকরা এক-দুই মাসের বেশি মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেক ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিক অন্তঃসত্ত্বা জানতে পারলে চাকরিচ্যুত করা হয়। ফলে চাকরিচ্যুত অন্তঃসত্ত্বা নারী শ্রমিক অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
বলা হয়, একজন সুস্থ মা-ই পারেন একজন সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে। তাই পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকদের প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্ববহ। একে গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো, নারী আর মাতৃত্ব আলাদা করা যায় না। প্রজননস্বাস্থ্য সেবার প্রতি যদি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়, তাহলে তাদের উৎপাদনশীলতা অনেক বাড়বে। আর যদি স্বাস্থ্যসেবা না পান, তাহলে শিল্প, শিল্পমালিক ও দেশের অর্থনীতিরই ক্ষতি। সে ক্ষেত্রে তাদের স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে সব ঠিক। তাই সরকারকে কারখানার মালিক, শ্রমিক, ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও বায়ারদের সমন্বয় করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে