শরতে ঢাকার কাছেই যেসব কাশবনে ঘুরতে পারেন
শরৎ এলেই বদলে যায় বাংলার প্রকৃতির চেনা চেহারা। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মৃদু বাতাস আর মাঠজুড়ে দুলতে থাকা কাশফুল—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ। ব্যস্ত নগরজীবনে যাদের দীর্ঘ ছুটির সুযোগ নেই, তারাও চাইলে ঢাকার কাছাকাছি কোনো কাশবনে গিয়ে উপভোগ করতে পারেন শরতের এই সৌন্দর্য।
পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার ছোট্ট ভ্রমণের জন্য ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জায়গা হতে পারে বেশ ভালো বিকল্প। তবে মনে রাখতে হবে, কাশফুলের অবস্থান প্রতিবছর এক থাকে না। জমির ব্যবহার, নির্মাণকাজ ও মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে কোনো এলাকায় কাশবন কমে যেতে পারে। তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া ভালো।
দিয়াবাড়ি, উত্তরা
কাশফুল দেখতে ঢাকার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িই হতে পারে সহজ একটি গন্তব্য। বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, জলাশয় আর কাশফুলের সঙ্গে শরতের আকাশ মিলিয়ে বিকেলে এখানে তৈরি হয় দারুণ দৃশ্য।
বিশেষ করে বিকেলের শেষভাগে সূর্যের নরম আলো কাশফুলের সাদা রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে এসে আবার শহরে ফেরার জন্য জায়গাটি বেশ সুবিধাজনক।
যেভাবে যাবেন: মেট্রোরেলে উত্তরা উত্তর স্টেশনে নেমে রিকশা বা অটোরিকশায় দিয়াবাড়ি যেতে পারবেন। চাইলে স্টেশন থেকে হেঁটেও যাওয়া যায়। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে উত্তরা হয়ে দিয়াবাড়িতে পৌঁছানো সম্ভব।
ভালো সময়: বিকেল ৪টা থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত।
পূর্বাচল
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে একটু খোলামেলা পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে পূর্বাচল হতে পারে আরেকটি পছন্দ। শরৎকালে এখানকার বিভিন্ন খোলা জায়গা ও লেকের আশপাশে কাশফুলের দেখা মেলে।
প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটানোর পাশাপাশি ছবি তোলার জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয়। তবে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে কাশফুল আছে কি না, যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নেওয়া ভালো।
যেভাবে যাবেন: কুড়িল থেকে ৩০০ ফুট সড়ক ধরে পূর্বাচলের দিকে যেতে হবে। এরপর স্থানীয় অটোরিকশা বা ব্যক্তিগত যানবাহনে লেকপাড় ও খোলা জায়গাগুলোতে যাওয়া যায়।
ভালো সময়: বিকেল থেকে সূর্যাস্ত।
আশুলিয়া
নদী, জলাশয় ও বিস্তীর্ণ খোলা জায়গার কারণে শরৎকালে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকাও হয়ে উঠতে পারে কাশফুল দেখার সুন্দর জায়গা। ঢাকার খুব কাছেই হওয়ায় দিনের অল্প সময় হাতে থাকলেও এখানে ঘুরে আসা সম্ভব।
তবে আশুলিয়ার সব জায়গায় একই সময়ে কাশফুল পাওয়া যাবে না। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে কাশবনের অবস্থান জেনে নিয়ে সেখানে যাওয়া ভালো।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সাভার বা আশুলিয়াগামী বাসে গিয়ে নামতে পারেন। এরপর রিকশা বা অটোরিকশায় আশপাশের খোলা মাঠ কিংবা কাশবনের এলাকায় যেতে পারবেন।
ভালো সময়: বিকেল।
মাওয়া ও পদ্মার চর
কাশফুলের সঙ্গে নদীর বিশাল জলরাশি দেখতে চাইলে যেতে পারেন মাওয়া ও পদ্মার আশপাশের চরাঞ্চলে। নদী, চর আর সাদা কাশফুল—তিনের মিলনে শরতের দৃশ্য এখানে অন্যরকম হয়ে উঠতে পারে।
তবে চরাঞ্চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রস্তুতি নিয়ে বের হওয়া দরকার। নদীপথে যেতে হলে স্থানীয় নৌকার ব্যবস্থা এবং ফেরার সময় আগে থেকেই নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে মাওয়া এলাকায় যাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয় নৌকায় উপযুক্ত চরাঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব।
ভালো সময়: বিকেল থেকে সূর্যাস্ত।
সময় ও পছন্দ অনুযায়ী গন্তব্য
খুব অল্প সময়ে ঘুরে আসতে চাইলে দিয়াবাড়ি সবচেয়ে সহজ বিকল্পগুলোর একটি। তুলনামূলক খোলামেলা পরিবেশ চাইলে পূর্বাচল বা আশুলিয়া বেছে নিতে পারেন। আর কাশফুলের সঙ্গে নদী ও চরাঞ্চলের দৃশ্য উপভোগ করতে চাইলে মাওয়া হতে পারে ভালো পছন্দ।
কাশবনে গেলে যেসব বিষয় মনে রাখবেন
কাশফুল দেখতে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতি না করাই সবচেয়ে জরুরি। ছবি তোলার জন্য ফুল ছেঁড়া কিংবা গাছপালা নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে প্রবেশের আগে মালিকের অনুমতি নিতে হবে।
নদী, খাল বা জলাশয়ের কাছাকাছি গেলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বর্ষার পানি বা বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গা কাদাময় ও পিচ্ছিল থাকতে পারে। বিকেলে ঘুরতে গেলে ফেরার যানবাহনের ব্যবস্থাও আগে নিশ্চিত করে রাখা ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি কাশবন দেখে সেটিকে প্রতিবছরের একই জায়গা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরৎ এলেই কাশফুল ফুটলেও জমির পরিবর্তনের কারণে এর বিস্তৃতি ও অবস্থান বদলে যেতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে বের হওয়াই নিরাপদ।
শরতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সব সময় দূরের কোনো পর্যটনকেন্দ্রে ছুটতে হয় না। শহরের ব্যস্ততার খুব কাছেই কখনো কখনো অপেক্ষা করে থাকে প্রকৃতির ছোট্ট এক টুকরো প্রশান্তি। বিকেলের নরম আলোয় সাদা কাশের ঢেউ দেখতে দেখতে কয়েক ঘণ্টার সেই ভ্রমণই হয়ে উঠতে পারে শরতের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি।
মতামত দিন