Views Bangladesh Logo

দেশজুড়ে চলছে নির্বাচনী সহিংসতা, ভোটের দিন কী হবে?

Misbah  Jamil

মিসবাহ জামিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই সংঘর্ষ, সহিংসতা, হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও আশঙ্কা। প্রশ্ন উঠছে- ভোটের দিন কী হবে?

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে অন্তত ২৫টির বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় ২ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজন নিহত হয়েছেন।

গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াত সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রটারি রেজাউল করিম নিহত হন। ওইদিন শেরপুর-৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক আয়োজিত ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বাগবিতণ্ড এবং হাতাহাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে ভোটের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় দৌলতপুর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের পিপুলবাড়িয়া বাজারে এঘটনা ঘটে।

একই দিন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে স্বতন্ত্র প্রার্থী (চিংড়ি প্রতীক) ও ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দুই জনকে আটক করে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ওইদিনই ভোলার মনপুরায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি নওগাঁয় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে দুইপক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। ওইদিন বিকেলে নওগাঁ সদর উপজেলার মাখনা কোমলগোটা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যের গণসংযোগ চলাকালে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়ায় দুপক্ষ। এসময় অন্তত ১০ জন আহত হন। সদর উপজেলার কালিরবাজারে এ ঘটনা ঘটে।

গত ২৫ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধা উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ জন আহত হন। এ সময় ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি মোটরসাইকেল। উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কাসাইটারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

গত ২২ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীতে নির্বাচনী প্রচারণার মিছিলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দু’গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের ১০ জন আহত হন।

একইদিন লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জে ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জামায়াতের তিন কর্মী এবং বিএনপির এক কর্মী আহত হন।

ওইদিন সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৯ জন আহত হন।

গত ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। উপজেলার গোপালদী পৌরসভার মোল্লারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

ওইদিন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ঘটনায় দুই পক্ষের ১২ নেতা-কর্মী আহত হন। নির্বাচনী প্রচারণা বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনা ঘটে।

গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় উভয়পক্ষের কয়েক জন আহত হন।

গত ৩০ জানুয়ারি বিকেলে পটুয়াখালীর বাউফলে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় দুজন আহত হন।

২৫ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। উপজেলার যুগিরহুদা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

একইদিন ময়মনসিংহের ভালুকা বাসস্ট্যান্ড ও হবিরবাড়ি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোর্শেদ আলমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ৩০ জন আহত হন।

গত ৯ ডিসেম্বর গাজীপুর-১ আসনে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপির ২ গ্রুপের সংঘর্ষে ১২ জন আহত হন।

গত ২৭ নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২৫ জন আহত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরের দিন প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। দেশে সহনশীলতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পর ৫ হাজার ৭৬৩টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাগুলি লুট হয়েছে। এর মধ্যে এখনও প্রায় ১,৩৬২টি অস্ত্র পাওয়া যায়নি। তারা সতর্ক করছেন, এই অস্ত্রগুলো ভোটের আগে সহিংসতায় ব্যবহার হতে পারে।

অপরদিকে গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্র ও বিস্ফোরকও দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করছে। সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং ভোটের দিনও কঠোর নজরদারি চালানো হবে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ হাজার কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৮০টি কেন্দ্রকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে টহল, দেহে পরিধেয় ক্যামেরা, সিসিটিভি ও ড্রোন মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া, নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ডগ স্কোয়াড, আনসার সদস্য ও সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল দল প্রতিটি কেন্দ্রে র‌্যাপিড রেসপন্সে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

এদিকে অপতথ্য ও গুজব রোধের বিষয়ে ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার সাথেও আলোচনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমদ।

গত বৃহস্পতিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আমরা ইন্টারনেটের গতি কমানো বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে যাওয়ার পরিবর্তে বরং বিদ্রুপাত্মক, আক্রমণাত্মক কন্টেন্ট বা অপপ্রচারগুলো যাতে সরিয়ে নেয়া হয়, সেভাবেই তাদের অনুরোধ করেছি।

ওইদিন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি কেমন এবং ভোট নিয়ে কোনো শঙ্কা আছে কিনা- তা জানতে চেয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইইয়াবস। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে ইইউ নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ মিশনের বৈঠকে তারা এসব জানতে চান।

ইসি সচিব আখতার বলেন, আমরা প্রস্তুতি সম্পর্কে বললাম। ইতোমধ্যে ১১৬ আসনের ব্যালট পেপার আমরা পাঠিয়েছি এবং রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর বাকিটা আমরা ইন দা প্রসেস এবং ৭ ফেব্রুয়ারির ভেতরে ইনশআল্লাহ বাকি ব্যালটগুলো পৌঁছে দিতে পারব।

এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে সবাইকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ব্যক্তি, দল, কিংবা রাজনৈতিক কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নে জড়িত হওয়া যাবে না।

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১ লাখ, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী ৫ হাজার, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ (স্থলভাগ-১ হাজার ২৫০), বাংলাদেশ পুলিশ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, র‌্যাব ৭ হাজার ৭০০, এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ইসির কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৩টি সংসদীয় আসনকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ৮৫টি আসন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আরো। পাশাপাশি সারা দেশে ৮,৭৪৬টি ভোটকেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং আরও ১৬,৩৫৯টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার মোতায়েনের পাশাপাশি মোবাইল টিম, কুইক রেসপন্স ইউনিট এবং মোট ১০৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনকালীন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। এর পাশাপাশি বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরাও মাঠে থাকবেন।’

ইসি সচিব বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আমরা শুধু জনবল বাড়াচ্ছি না, গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আশা করছি এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন করতে পারবো।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ