সকালে কখন ঘুম থেকে উঠবেন? সুস্থ জীবনযাপনের জন্য কোন সময়টি ভালো
রাত জেগে কাজ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো কিংবা অনিয়মিত জীবনযাত্রার কারণে এখন অনেকেরই ঘুমের রুটিন এলোমেলো। কেউ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, আবার কেউ সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয় জোর দিয়ে বলে আসছেন—সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীর ও মনের জন্য উপকারী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঠিক কত সকালে ঘুম থেকে ওঠা উচিত? ভোর ৫টা, ৬টা নাকি ৭টা? সবার জন্য কি একই নিয়ম প্রযোজ্য? এ বিষয়ে চিকিৎসক ও গবেষকদের মতামত বলছে, ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা।
কেন সকালে ওঠার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা?
মানবদেহ একটি প্রাকৃতিক জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ অনুসরণ করে। সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সন্ধ্যার পর অন্ধকার বাড়তে শুরু করলে শরীরে মেলাটোনিন নামের হরমোন নিঃসরণ হয়, যা ঘুমের অনুভূতি তৈরি করে। অন্যদিকে সকালে সূর্যের আলো চোখে পড়লে শরীর জেগে ওঠার সংকেত পায় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে ঘুমানো ও জাগা শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কোন সময়ে ঘুম থেকে ওঠা সবচেয়ে ভালো?
অনেকেই মনে করেন, রাতে কখন ঘুমাতে গেছেন তার ওপরই সকালে ওঠার সময় নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কেউ রাত ১১টায় ঘুমান, তাহলে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমের জন্য সকাল ৬টা বা ৭টায় উঠতে পারেন।
তবে চিকিৎসকদের মতে, বিষয়টি শুধু হিসাবের নয়। প্রথমে ঠিক করতে হবে আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য কখন দিন শুরু করা সবচেয়ে সুবিধাজনক। সেই সময়কে কেন্দ্র করে ঘুমের রুটিন তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ সকালে যদি ৬টায় উঠতে হয়, তাহলে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। আবার যদি রাত ১২টার আগে ঘুমানো সম্ভব না হয়, তাহলে সকাল ৭টার আগে ওঠা শরীরের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।
কত ঘণ্টা ঘুম জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। অনেকের ক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টা ঘুম সবচেয়ে উপকারী হলেও কারও কারও জন্য ৭ ঘণ্টা যথেষ্ট হতে পারে।
তবে নিয়মিত ৬ ঘণ্টার কম ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে—
-মনোযোগ কমে যায়
-স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে
-রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়
-মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ে
-হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে
তাই শুধু ভোরে ওঠার জন্য ঘুম কমিয়ে ফেলা কখনোই স্বাস্থ্যকর নয়।
সবাই কি সকালে ওঠার মানুষ?
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই রাতে দেরিতে ঘুমাতে এবং সকালে দেরিতে উঠতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিজ্ঞানীরা এটিকে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন জৈবিক প্রবণতা হিসেবে দেখেন।
অর্থাৎ সবাইকে জোর করে ভোর ৫টায় উঠতে হবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কর্মজীবন, শিক্ষাজীবন বা দৈনন্দিন দায়িত্বের কারণে অনেকের জন্য সকালে ওঠা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
কীভাবে ধীরে ধীরে সকালে ওঠার অভ্যাস করবেন?
হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে ওঠা সাধারণত কার্যকর হয় না। বরং ধীরে ধীরে শরীরকে নতুন রুটিনে অভ্যস্ত করতে হবে।
১. অল্প অল্প করে সময় এগিয়ে আনুন
প্রথমে প্রতিদিনের তুলনায় ৩০ মিনিট আগে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। কয়েকদিন পর আরও ১৫ থেকে ২০ মিনিট এগিয়ে আনুন। এভাবে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানো সহজ হবে।
২. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান
প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের জৈবিক ঘড়িকে স্থিতিশীল করে।
৩. ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমান
ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা টেলিভিশন ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। এসব ডিভাইসের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে বাধা দেয়।
৪. রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খান
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, রাত ৮টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করতে। খাবার ও ঘুমের মধ্যে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যবধান রাখা ভালো।
৫. ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন
ঘুমের জন্য অন্ধকার, নীরব ও তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। আরামদায়ক বিছানা ও সঠিক তাপমাত্রা ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
৬. অ্যালার্ম দূরে রাখুন
অনেকেই অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। এ অভ্যাস এড়াতে ঘড়ি বা মোবাইল বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখুন, যাতে অ্যালার্ম বন্ধ করতে উঠে যেতে হয়।
৭. অ্যালার্ম বাজতেই উঠে পড়ুন
অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও পাঁচ মিনিট শোয়ার চিন্তা অনেক সময় আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের ঘুমে পরিণত হয়। তাই অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
সকালে উঠে কী করলে দিন ভালো কাটে?
সকালের সময়টিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করলে দিনের শুরু আরও প্রাণবন্ত হতে পারে। যেমন—
-গাছে পানি দেওয়া
-হালকা ব্যায়াম বা হাঁটা
-চা বা কফি তৈরি করা
-বই পড়া
-ধ্যান বা প্রার্থনা করা
-স্বাস্থ্যকর নাশতা প্রস্তুত করা
এসব কাজ মনকে প্রশান্ত রাখে এবং সারাদিনের জন্য ইতিবাচক মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে