পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান
নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে ভারতজুড়ে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মুখে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মূলত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছিল।
সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তার পদত্যাগপত্র তুলে ধরা হলো—
আমার তরুণ বন্ধুরা,
গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংস্কারের প্রতি নিবেদিত থেকেছি। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তি।
দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি এবং ন্যায্য প্রত্যাশাকে আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই আমাদের সবার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের নৈতিক সংকল্প। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের সেবা করার সুযোগ পাওয়ায় আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
তবে ৩ মে ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় একটি অনিয়ম সামনে আসে এবং তা শনাক্ত হয়। এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে ভারত সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইয়ের হাতে ন্যস্ত করে, পরীক্ষা বাতিল করে এবং পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। এর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামী বছর থেকে এই পরীক্ষা সিবিটি (কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা) পদ্ধতিতে নেওয়া হবে।
এই সময়ে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল, বিশ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। এ জন্য সামগ্রিক সরকারি (হোল অব গভর্নমেন্ট) পদ্ধতিতে কাজ হয়েছে। এতে ভারত সরকারের পাশাপাশি রাজ্য সরকার—বিশেষত জেলা প্রশাসন—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২১ জুন ২০২৬ তারিখে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
শুরুর দিন থেকেই আমি এর দায়িত্ব নিয়েছি এবং কখনো পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমার সংকল্প ছিল, পরীক্ষা মাফিয়ার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয় এবং কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি যেন অবিচার না হয়।
১৬ জুলাই ঘোষিত নিট-ইউজির ফলাফল সন্তোষজনক ছিল, যেখানে দরিদ্র পরিবারের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও সফল হয়েছে।
কিন্তু এই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি অনেক শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করতে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, যা আমার হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে।
আমাদের গণতন্ত্রের শক্তির প্রতি আমার সবসময় অটুট বিশ্বাস ছিল, এবং তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে আমি সবসময় গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেছি। তারা কেবল ভারতের ভবিষ্যৎই নয়, বরং একটি নতুন ও উন্নত ভারতের ভবিষ্যতের বাহক, নির্মাতা ও স্থপতিও।
গত দশ দিনের ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। এটি আমার ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়।
ভারতের তরুণশক্তিই এই দেশের প্রকৃত শক্তি।
দেশের তরুণশক্তি যেন বিভ্রান্তির দুষ্টচক্রে আটকে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই আমার সংকল্প।
যন্তরমন্তরে ও দেশজুড়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ যেন রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি না নেয়; দেশের ঐক্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে; ভারতের একজন শিক্ষার্থীরও ভবিষ্যৎ যেন আইনি জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে; আমাদের সন্তানেরা যেন তাদের সময় পড়াশোনায় ব্যয় করে ও ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দেয়—এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, আস্থা ও নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের জন্য আমি তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদের আমার সম্মানিত সহকর্মীবৃন্দ, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যাঁদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তাঁদের সবার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জাতির সেবাই আমার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমি সবসময় তার প্রতি নিবেদিত থাকব।
ভগবান শ্রী জগন্নাথের আশীর্বাদে, ভবিষ্যতেও আমি ভারতমাতা, ওডিশার জনগণ এবং দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে যথাসাধ্য নিবেদিত থাকব।
আপনাদের, ধর্মেন্দ্র প্রধান
মতামত দিন