সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের আকাশ থেকে বাঘ দেখানোর পরিকল্পনা
সুন্দরবনের ভারতীয় অংশকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ধরনের পর্যটন পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর অংশ হিসেবে জনবসতিহীন দ্বীপগুলোতে ফাইভ-স্টার পরিবেশবান্ধব ট্রি-হাউস রিসোর্ট নির্মাণ এবং কম শব্দের উড়োজাহাজে আকাশ থেকে বাঘ দেখার সুযোগ চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
রোববার সুন্দরবন সফরে গিয়ে গোসাবায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব পরিকল্পনার কথা জানান পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মিঠুন চক্রবর্তী। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, সুন্দরবনে ৮ থেকে ১০টি জনবসতিহীন দ্বীপ রয়েছে। এসব দ্বীপে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ফাইভ-স্টার পরিবেশবান্ধব ট্রি-হাউস রিসোর্ট নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে। এ জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দ্বীপের জমি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রয়োজনে সরকার স্থায়ীভাবেও জমি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
তবে রিসোর্ট নির্মাণে কংক্রিটের স্থাপনা করা যাবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, এসব দ্বীপে ফাইভ-স্টারের নিচের মানের কোনো রিসোর্ট নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এমন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত রিসোর্টগুলোর কর্মীদের বড় একটি অংশ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। মিঠুন চক্রবর্তী জানান, প্রতিটি রিসোর্টের মোট কর্মীর ৮০ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা হতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি রিসোর্টে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন স্থানীয় তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির শর্ত রাখা হবে।
তবে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকায় বড় আকারের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীদের একাংশ। পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত বলেন, সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে সবার আগে এর পরিবেশ অক্ষত রাখা জরুরি। পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
মিঠুন চক্রবর্তী অবশ্য বলেছেন, পরিবেশ ও বনসংক্রান্ত আইন মেনেই সুন্দরবনের উন্নয়ন করতে হবে। পুরো কার্যক্রমই পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।
সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মকর্তারা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শনিবার সুন্দরবন সফরে যান মিঠুন। ওই দিন গোসাবার একটি পাঁচতারা হোটেলে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন দপ্তরের সচিব, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক, মহকুমাশাসক, স্থানীয় বিধায়ক এবং সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের উপ-ক্ষেত্র পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
রোববার গোসাবায় একটি লঞ্চে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মিঠুনের সঙ্গে ছিলেন গোসাবার বিজেপি বিধায়ক বিকর্ণ নস্কর।
সুন্দরবনে পর্যটকদের জন্য আরেকটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মিঠুন। তার ভাষ্য, গোসাবায় হেলিপ্যাড থাকলেও হেলিকপ্টারের তীব্র শব্দ বন্যপ্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সেখানে হেলিকপ্টার ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যায় না। তাই কম শব্দের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আকাশ থেকে বাঘ দেখানোর ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।
ধর্মীয় পর্যটনকেও পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। মা মনসা ও বনবিবির মন্দিরগুলো সংস্কার করে সেগুলোকে একটি ধর্মীয় পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি একটি গ্রামীণ হাট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে সন্ধ্যায় পর্যটকেরা লোকসংগীত উপভোগ করতে পারবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা সুন্দরবনের মধু ও হস্তশিল্প বিক্রির সুযোগ পাবেন।
পর্যটন অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ডলফিন দেখার জন্য দুটি নতুন জেটি, একটি ম্যানগ্রোভ পরিচয়কেন্দ্র এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে একটি জাদুঘর তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া চলচ্চিত্র ও শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও সুন্দরবনকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মিঠুন চক্রবর্তী জানান, পশ্চিমবঙ্গে শুটিংয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। দেশ-বিদেশের যে কেউ সেখানে শুটিং করলে এ সুবিধা পাবেন। এর ফলে সুন্দরবনেও শুটিং বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মতামত দিন