ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার
ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। শনিবার হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানানো হয়। এদিকে ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খোঁজে চালানো তল্লাশি কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো।
শুক্রবারের তুলনায় মৃতের সংখ্যা ৩০০ জনের বেশি বেড়ে পৌঁছেছে ২ হাজার ৯৫৪ জনে। গত ২৪ জুনের এই বিপর্যয়ে গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ এখন রাস্তায় ও অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছেন।
এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। সরকার এ বিষয়ে কোনো হিসাব না দিলেও জাতিসংঘের ধারণা, ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পন দুটির পর ৫০ হাজার পর্যন্ত মানুষের কোনো হদিস মিলছে না।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই ভূমিকম্প বিপর্যয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরে উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল, যেখানে বহু আবাসিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
মাত্র ৩৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা জোড়া কম্পনের ১০ দিন পর উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিতদের খোঁজার কাজ শেষ করে আনছে; অন্যদিকে স্বজনেরা এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রিয়জনের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে জীবিত উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা সাধারণত ৭২ ঘণ্টা পরই শেষ হয়ে যায়। যদিও চলতি সপ্তাহেও অল্প কয়েকজনকে জীবিত পাওয়া গেছে।
উদ্ধার অভিযান গুটিয়ে আনার আভাস দিয়ে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস এক অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক দলগুলোর সদস্যদের—এমনকি তাদের উদ্ধারকারী কুকুরদেরও—পদক তুলে দেন। রদ্রিগেস বলেন, ভেনেজুয়েলা এখন ‘গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পরিবারগুলো এখনো প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছে, বহু মানুষ সবকিছু হারিয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দলসহ আন্তর্জাতিক দুর্যোগ মোকাবিলা দল এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দল উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করে আনছে বলে শনিবার তাদের সদস্যরা জানান। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের উদ্ধারকারী দল সর্বশেষ তল্লাশিতে প্রাণের কোনো চিহ্ন না পেয়ে অভিযান শেষ করছে; ফ্লোরিডা ও ভার্জিনিয়ার দলগুলোও এই সপ্তাহান্তে গোছগাছ করে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুর্যোগে সরকারের ধীরগতির সাড়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক ভেনেজুয়েলান। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক দল পৌঁছানোর আগে প্রথম কয়েক ঘণ্টা পরিবারগুলোকে নিজ হাতেই স্বজনদের ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করতে হয়েছে। তবে রদ্রিগেস তার সরকারের ভূমিকার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, হাজার হাজার সেনা ও কর্মকর্তাকে মাঠে পাঠানো হয়েছিল।
লা গুয়াইরায় শনিবার ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে শ্রমিকেরা ধসে পড়া স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু করেছেন; কোথাও কোথাও পরিবারগুলো তখনো দাফনের জন্য স্বজনদের মরদেহ বের করার চেষ্টা করছিল। ধসে পড়া একটি বাসভবনে খোঁড়াখুঁড়িতে সহায়তাকারী ভেনেজুয়েলান স্বেচ্ছাসেবী ফ্রান্সিসকো সাসকিয়া বলেন, ‘আমরা এখনো কাজ করছি, এখনো মরদেহ খুঁজছি। আমরা থামিনি। এটা মোটেও সহজ ছিল না। আমরা দুটি মরদেহ পেয়েছি, সেগুলো ইতিমধ্যে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
জাতিসংঘের হিসাবে, জোড়া ভূমিকম্পে ৬৭০ কোটি ডলারের ভৌত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা তেল রপ্তানিকারক দেশ ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশের সমান। এই দুর্যোগ আঘাত হানার আগে থেকেই কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ধুঁকছিল দেশটি, যা তার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবাকে নাজুক করে তুলেছিল।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারাকাসের জন্য ব্যবহৃত লা গুয়াইরার মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও। মানবিক সহায়তাবাহী ফ্লাইট নামার জন্য এটি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হলেও বাণিজ্যিক ফ্লাইট এখনো বন্ধ। আরেক অনুষ্ঠানে রদ্রিগেস বলেন, ‘মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে—এমন কিছু আন্তর্জাতিক অংশীদার ও দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ চলছে। আগামী সপ্তাহে একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়ে যাবে।’
ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া ভাতিজার মরদেহের পাশে থাকাটাই এখন ভিক্তর কলিভার্তের কাছে সবচেয়ে জরুরি। কালো ব্যাগে রাখা মরদেহটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে হারিয়ে ফেলার ভয়ে আছেন তিনি; ফরেনসিক কর্মীদের মরদেহ নিয়ে যেতেও বাধা দিয়েছে তার পরিবার। তিনি বলেন, ‘দরকার হলে চীনে যাব, যেখানে যেতে হয় যাব, কিন্তু ওকে একা ছাড়ব না। আমি ওর সঙ্গেই যাব।’
মতামত দিন