ইরানের পাঁচ তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জর্ডানে হামলা তেহরানের
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত দুই দিনে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের দুই দফা হামলার জবাবে ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে তারা।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ওমান উপসাগরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর চারটি তেলবাহী জাহাজে এবং ইরানের উপসাগরীয় উপকূলের কাছে খার্ক দ্বীপের কাছে থাকা আরেকটি জাহাজে হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আক্রান্ত জাহাজগুলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের অর্থায়নে ব্যবহৃত ‘ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেন হয় বলেও দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। জর্ডানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্রের দাবি, দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে।
ইরান আরও পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের কাছে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলোর ক্রুদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এর আগে ইরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। সেন্টকম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ওই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা যতবার করবে, ততবারই তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।
কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলা বা হামলার চেষ্টা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার শিকার ইরানি তেলবাহী জাহাজটি খার্ক দ্বীপের কাছে ছিল। ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান টার্মিনাল রয়েছে এই দ্বীপে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের টার্মিনাল হয়ে রপ্তানি করা হয়। মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে সেখানে জাহাজে তোলা হয়।
ফলে খার্ক দ্বীপের আশপাশে হামলার ঘটনায় ইরানের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের বাজারেও পড়েছে।
এশিয়ার লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে ওঠে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে দাঁড়ায়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হামলার পর কয়েকটি তেল স্থাপনা ও অবকাঠামোতে আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে কিছু কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করে, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন সাবমেরিন দখল করেছে।
তবে সেন্টকমের মুখপাত্র মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স দাবি করেন, পানির নিচে ব্যবহৃত মার্কিন ড্রোনটি এক দিনেরও বেশি সময় আগে বিকল হয়ে যায়। আঞ্চলিক জলসীমায় চলমান মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করার জন্য এটি ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে জানান তিনি।
হকিন্সের ভাষ্য, ড্রোনটি পুরোনো মডেলের এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য, গোপনীয় সোনার বা রাডার সরঞ্জাম ছিল না।
তিনি জানান, আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। গত এক সপ্তাহে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বেড়ে যাওয়ায় সংঘাতটি এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মতামত দিন