হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণার পর ইরানে তৃতীয় দফায় হামলা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে এটি ইরানে তাদের তৃতীয় দফার সামরিক হামলা। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) হামলার জবাবে স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রোববার ভোরে) এ হামলা শুরু হয় বলে এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছে সেন্টকম। পরে তারা জানায়, এ দফায় ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস ও হরমুজ প্রণালিসংলগ্ন কেশম দ্বীপসহ দেশটির বেশ কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। আইআরজিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে বেশ কয়েকটি ঘাঁটি ও যোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত হেনেছে।
এর আগে আইআরজিসির নৌবাহিনী ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। তাদের দাবি, প্রণালিতে 'অননুমোদিত নৌপথ' ব্যবহার করায় একটি জাহাজকে 'সতর্কতামূলক গুলি' ছুড়ে থামানো হয়েছে। ওই ঘটনার পরই প্রণালিটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেন্টকমের দাবি, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের কনটেইনার জাহাজে আইআরজিসি 'নির্লজ্জ হামলা' চালানোর পরই যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা শুরু করেছে। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং ইঞ্জিনরুম গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটি আর যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারেনি; জাহাজটির এক বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। ব্রিটিশ মেরিটাইম সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমান উপকূল থেকে ৯ নটিক্যাল মাইল পূর্বে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; হামলার পর ক্রুরা জাহাজ ছেড়ে একটি লাইফবোটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
সেন্টকম বিবৃতিতে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলার জন্য জবাবদিহির মুখে পড়ার পরও ইরানকে সমঝোতা স্মারক মেনে চলার আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা আবারও ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক্সে ওই বিবৃতি শেয়ার করে লিখেছেন, 'বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তার মূল্য দিতে হবে।'
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাহাজে হামলার ঘটনাটি ঘটে হরমুজ সংকট নিরসনে ওমানে আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে ওমানে পৌঁছান এবং ওমানি ও কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সিএনএনের খবরে বলা হয়, ওমান এমন একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে, যাতে প্রণালিতে দুটি পৃথক করিডর দিয়ে জাহাজ চলাচলের কথা বলা হয়েছে—ওমানি জলসীমা দিয়ে দক্ষিণের করিডরে জাহাজ যুদ্ধপূর্ব নিয়মে অবাধে চলবে, আর ইরানি জলসীমার উত্তরের করিডর ব্যবহারে লাগবে ইরানের পূর্বানুমতি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি ওমানের জলসীমার ভেতর দিয়ে দক্ষিণের সেই পথেই চলছিল, যে পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে পাল্টা জবাবের দাবি করেছে ইরানও। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হ্যাঙ্গার এবং একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে আঘাত হেনে সেগুলো ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার জানিয়েছে, তারা ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমান উপকূলের কাছে তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনার পর বুধ ও বৃহস্পতিবার ইরানের ছয়টি শহরে দুই দফা বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হন। পাল্টা জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর মধ্যেই গত বুধবার আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের হামলার পর যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ পূর্বসূরিদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া 'অবশ্যম্ভাবী'। গত বৃহস্পতিবার বাবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার দুই দিন পর এটিই ছিল তার প্রথম বার্তা।
টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত ওই বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, 'এই প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা কেবল আমার বা আমাদের প্রশাসনের নয়, এটি আমাদের ইরানি জাতির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ইচ্ছা এবং এই প্রতিশোধ অবশ্যম্ভাবীভাবে বাস্তবায়িত হবে।' তিনি আরও বলেন, 'এই অবশ্যম্ভাবী বিষয়টি কেবল আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব কিংবা সরকারের অন্য কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। আমরা বেঁচে থাকি আর না থাকি, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত প্রতিশোধ একদিন নেওয়া হবেই।'
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। মৃত্যুর প্রায় চার মাস পর ছয় দিনের শোকানুষ্ঠান শেষে গত বৃহস্পতিবার মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে তাকে দাফন করা হয়। শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক ইরানিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ডের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায়। এর জবাবে শনিবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাকে হত্যার কোনো চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সবকিছু ধ্বংস করে দেবে।
মতামত দিন