ইরানের একাধিক শহরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, পাল্টা জবাব তেহরানের
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধূলিসাৎ করতেই এই সাম্প্রতিক হামলা চালানো হয়েছে। এর আওতায় ইরানের উপকূলীয় নিরাপত্তা ঘাঁটি, বিমান হামলা প্রতিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধাদানে ব্যবহৃত সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
মার্কিন হামলার জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা আঘাতের দাবি করা হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রথমে একটি মার্কিন জাহাজ এবং পরবর্তীতে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন যোগাযোগ কেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এছাড়া হরমুজ প্রণালির আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে অঞ্চলটির অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে ঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগারে আগুন ধরে যায় এবং একটি প্যাট্রিয়ট রাডার, নৌবহরের এয়ার কন্ট্রোল রাডার, সি-র্যাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও মানববিহীন সারফেস ভেসেল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আবু মুসা, কেশম ও কিশ দ্বীপসহ বাণিজ্যিক বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটেছে। এছাড়া ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোসমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোনারাক, চাবাহার, বুশেহর, খুজেস্তান, ওমিদিয়েহ, জাম ও কানগানেও মার্কিন বোমাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ওমিদিয়েহতে হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ইরানের ১৫৯টি যুদ্ধজাহাজ ও ২০০টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাদের রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৮৪ শতাংশই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত।
ইরানকে প্রায় ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প বলেন, চার মাস আগের ইরানের সঙ্গে বর্তমান ইরানের কোনো মিল নেই।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটির দুটি তেলবাহী সুপারট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং ছয় ভারতীয় ও দুই ইউক্রেনীয়সহ মোট আটজন আহত হয়েছেন।
এই হামলার নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে মন্ত্রণালয়।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, এই হামলাটি আইআরজিসি চালিয়েছে।
এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে আরব আমিরাত।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, পূর্বাঞ্চলীয় সময় মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ইরানের সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করা হবে।
তিনি বলেন, এতে ইরানের জাহাজ বা তাদের গ্রাহকরা এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না, তবে অন্য দেশগুলোর জন্য প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে।
সেন্টকম জানিয়েছে, ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই অবরোধ মূলত ইরানের জাহাজের ওপর প্রযোজ্য হবে, তবে অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে মার্কিন বাহিনী।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় তীব্র কটাক্ষ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাওয়ার বিষয়টি ঠিক আছে। তবে ২০ শতাংশ চার্জের হার অনেক বেশি এবং ইরান এর চেয়ে অনেক ন্যায্য ও যৌক্তিক হার নির্ধারণ করবে।
মতামত দিন