ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন ভ্যান্স-গালিবাফ
ঐতিহাসিক আলোচনার আগে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড়তে রাজি যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। আলোচনা শুরুর ঠিক আগমূহুর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মেনে নিয়েছে। কাতার ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ করে রাখা ইরানের সম্পদ মুক্ত করে দিতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। ইতিমধ্যে আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।
ইরানের শর্ত মেনে নিল যুক্তরাষ্ট্র
আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত মেনে নিয়েছে। ইরানের এক কর্মকর্তা শনিবার (১১ এপ্রিল) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শর্ত অনুযায়ী কাতার ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে জব্দ করে রাখা ইরানের সম্পদ মুক্ত করে দিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে আলোচনার আগে তাদের ‘সদিচ্ছার পরীক্ষা’ হিসেবে দেখছে ইরান। এটি আলোচনার প্রতি ওয়াশিংটনের গুরুত্বেরও ইঙ্গিত বহন করে।
ইরানি ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ার এই বিষয়টি সরাসরি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ ইরান হরমুজে নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল নিশ্চিত করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আটকে রাখা সম্পদ মুক্ত করবে।
এর আগে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্পষ্ট জানান, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ততক্ষণ শুরু হবে না, যতক্ষণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হয় এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে না দেয়।
ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন ভ্যান্স ও গালিবাফ
শুক্রবার রাতে ইরানের প্রতিনিধি দল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধিদলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও কয়েকজন আইনপ্রণেতা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।
বিমানবন্দরে ইরানি ও মার্কিন উভয় প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার, সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
ইরানি প্রতিনিধি দল যে বিমানে ইসলামাবাদে এসেছে, তার নাম ‘মিনাব ১৬৮’। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই নামের মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত ১৬৮ জন ইরানি নাগরিককে, যাদের মধ্যে শিশুরাও ছিল। ইসলামাবাদে অবতরণের পর গালিবাফ এক্সে একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘এই ফ্লাইটে তারা আমার সহযাত্রী।’
ইসলামাবাদে শুরু প্রাক-আলোচনা
এর মধ্যে, ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে অবস্থানরত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈঠকে ভ্যান্সের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, এ বৈঠকে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় ধাপ হবে এবং দুই পক্ষকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত।
এর আগে, সকালে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধিদলও শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে। পাবলিক ব্রডকাস্টার আইআরআইবি জানিয়েছে, এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির অঙ্গীকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতে পারে ইরান।
আইআরআইবির সংবাদদাতার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে এই বৈঠক শুরু হয়। আলোচনায় ইরান তাদের ১০ দফা প্রস্তাব নিয়েও কথা বলবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের কাঠামো হিসেবে বিবেচিত। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ইরানি আলোচক দল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে।
সকালে প্রথম দফা আলোচনা
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট নিশ্চিত করেছেন, স্থানীয় সময় শনিবার সকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে প্রথম দফা আলোচনা হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হওয়ার সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং ইরান যদি আন্তরিক হয়, তাহলে তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে বাধ্য থাকবে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আলোচনার নামে ইরান যদি কোনো কৌশল বা প্রতারণা করে, তাহলে মার্কিন প্রতিনিধি দল তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না এবং সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হবে না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানান, শনিবার সকালে আলোচনার প্রথম দফা শুরু হবে। যাত্রার আগে ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ইরান আন্তরিক হলে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে প্রস্তুত। তবে ইরান চালাকি করলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাবে না যুক্তরাষ্ট্র।
আলোচনার প্রাধান্য পাবে কী কী ইস্যু?
বৈঠকে যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কয়েকটি জটিল ইস্যুতে আলোচনা হবার কথা। তজরিপ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষের মধ্যে বিতর্কিত সম্ভাব্য ইস্যুগুলো হলো: ইরান চায় লেবাননে একইসাথে যুদ্ধবিরতি হোক, যেখানে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে, এতে ইসরায়েল ইতোমধ্যেই আপত্তি জানিয়েছে।
ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি চায়, যা ওয়াশিংটন ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এক্ষেত্রে ইরান কৌশলী হয়ে কিছুটা শিথীলতা দেখাতে পারে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস করতে চায়, কিন্তু তেহরান জানিয়েছে এটি তাদের জন্য অ-আলোচনাযোগ্য।
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বহু বছর ধরে তাদের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দেশটির জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে, যেটা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধসেনা প্রত্যাহার ও সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে, যেখানে ট্রাম্প শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এক্ষেত্রে, ইরান এই শর্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরান চায় হরমুজ প্রণালিতে তাদের কর্তৃত্ব স্বীকৃতি হোক, যেখানে তারা ট্রানজিট ফি সংগ্রহের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করতে চায়। একইসাথে, ইরান সেখান থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া অবকাঠামো সংস্কার করার কথাও জানিয়েছে।
এছাড়াও, ইরান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর প্রায় ৪০ দিন সংঘাত চলে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন ও তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। পাল্টা জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় উভয় পক্ষ।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে