Views Bangladesh Logo

বহিঃলেনদেনে বিকল্প পথ খুঁজছে ব্রিকস

ট্রাম্পের ছায়াতলে ডলার যুগের দুঃসময়

লারের বিপদ বাইরে থেকে যতটা, এখন যেন কিছুটা ঘরের ভেতর থেকেও। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার মহান করতে চান—শুল্ক বাড়িয়ে, বাণিজ্যের দরজা মেপে, নিষেধাজ্ঞার চাবিটি আরও শক্ত করে হাতে ধরে। কিন্তু পৃথিবীর বাজার বড় বিচিত্র জায়গা। সেখানে কাউকে বেশি ভয় দেখালে একসময় সে বেঁকে বসে; তখন সে বিকল্প দরজাটি কোথায়, সেটিও খুঁজতে শুরু করে। ব্রিকস এখন সেই পাশের দরজা খুঁজছে।

ডলারকে আজই বিদায় দেওয়ার সাহস কিংবা সামর্থ্য তাদের কারও নেই। পৃথিবীর রিজার্ভ, ঋণ, তেলবাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন মুদ্রা এখনো মহীরুহ। কিন্তু নয়া দিল্লিতে বসে ব্রিকস এবার একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছে—ভারত ব্রাজিলের কাছ থেকে পণ্য কিনবে, চীন রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করবে, কিংবা দুই উন্নয়নশীল দেশ নিজেদের মধ্যে হিসাব মেটাবে; মাঝখানে প্রতিবার আমেরিকার মুদ্রাকেই হাজিরা দিতে হবে কেন?

এ প্রশ্নটি ছোট নয়। কারণ ডলার শুধু টাকা নয়, ক্ষমতাও। যার মুদ্রায় পৃথিবী হিসাব রাখে, তার হাতে শুধু ছাপাখানা থাকে না—থাকে নিষেধাজ্ঞার শক্তি, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর প্রভাব এবং বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় সুইচবোর্ড। বহু বছর ধরে আমেরিকার ঘরে ওই সুইচবোর্ড। এখন ব্রিকস বলছে, সুইচবোর্ডটি শুধু ওয়াশিংটনে থাকবে কেন! আমাদের ঘরেও আরও কয়েকটি সুইচ থাকলে মন্দ কী?

ট্রাম্প ব্রিকসের ডলারবিরোধী তৎপরতা পছন্দ করেন না। অথচ তাঁর আমলেই শুল্কযুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক চাপের ভয় অনেক দেশকে ডলারের বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে। যে ডলারকে আরও শক্ত হাতে পাহারা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, সেই পাহারাই যেন দেয়ালের ওপারে নতুন রাস্তা খোঁজার কৌতূহল বাড়াচ্ছে।

এবারের ব্রিকস সম্মেলনে নয়া দিল্লিতে ডলারের বিরুদ্ধে কোনো বিপ্লব হয়নি। কোনো নতুন ব্রিকস নোটও ছাপা হয়নি। হয়েছে তার চেয়ে সম্ভবত বেশি বাস্তব একটি কাজ—রুপি, ইউয়ান, রুবল, রিয়াল এবং অন্য স্থানীয় মুদ্রাকে পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রা, পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য—একটির পর একটি ছোট সেতুর নকশা টেবিলে উঠছে।

ডলার এখনো রাজা। সিংহাসন অটুট। শুধু রাজপ্রাসাদের বাইরে কয়েকটি নতুন রাস্তার মাটি কাটা শুরু হয়েছে। আর পুরোনো রাজাদের ইতিহাস বলে—বিপদ সব সময় সিংহাসন ভাঙার শব্দ দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো শুরু হয় প্রজারা অন্য রাস্তা চিনে ফেললে।

১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সম্ভবত কোনো বক্তৃতা নয়, কোনো নেতার করমর্দনও নয়। ৪৫ পৃষ্ঠার ‘নয়া দিল্লি ঘোষণা’র ৯০ নম্বর অনুচ্ছেদের কয়েকটি নিরীহ বাক্য। সেখানে বলা হয়েছে, ব্রিকস পেমেন্ট টাস্কফোর্স সদস্যদেশগুলোর পেমেন্ট ও আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থাগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার উপায় পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। লক্ষ্য—আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানকে দ্রুত, কম ব্যয়বহুল, সহজলভ্য, দক্ষ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ করা। শুনতে বিষয়টি ভারী নিরীহ। ব্যাংকারদের সম্মেলনের ভাষা। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক বড় পরিবর্তন শুরু হয় এমন নিরীহ বাক্য দিয়েই।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাই এবারের ঘটনাটিকে ডি-ডলারাইজেশনের পথে ব্রিকসের আরেক ধাপ বলে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির বিশ্লেষণ বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন আর্থিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ডলারের প্রয়োজন কমানোর একটি ব্যবহারিক পথ খুঁজছে। তবে তারা কোনো ‘ব্রিকস মুদ্রা’ ঘোষণা করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাও সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন—এই মুহূর্তে ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রার কোনো প্রস্তাব নেই।

একটি নতুন মুদ্রা বানানো খুব রোমান্টিক ব্যাপার। পতাকা থাকবে, প্রতীক থাকবে, হয়তো নোটের ওপর এগারো দেশের কোনো মহান ঐক্যের ছবি থাকবে। কিন্তু মুদ্রা কবিতা নয়। মুদ্রা বিশ্বাস। তার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাগে, সুদের নীতি লাগে, বিনিময় হার লাগে, ঋণবাজার লাগে, বিপুল তারল্য লাগে এবং সবচেয়ে বড় কথা—এক দেশকে আরেক দেশের ওপর বিশ্বাস করতে হয়। ব্রিকসে সেই বিশ্বাস এখনো অসম্পূর্ণ।

চীন নিজের ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াতে চায়। ভারত চায় রুপির ব্যবহার বাড়ুক, কিন্তু আর্থিক অবকাঠামোর ওপর চীনের প্রভাব বাড়ুক না—এ নিয়ে দিল্লির সতর্কতা রয়েছে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলার ও ইউরোর বাইরে লেনদেনের পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের প্রয়োজন আরও জরুরি। ব্রাজিল বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার চায়, কিন্তু একটি চীননির্ভর মুদ্রাব্যবস্থা তারও লক্ষ্য নয়। অর্থাৎ একই বাসে সবাই উঠেছে, কিন্তু প্রত্যেকেরই গন্তব্য ভিন্ন।

রয়টার্স জানিয়েছে, ভারত এবারের সম্মেলনের আগে ব্রিকস সদস্যদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো ভবিষ্যতে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করার ধারণা সামনে আনে। কিন্তু এখানেও সমস্যা কম নয়। ভারত চীনের নেতৃত্বাধীন কিছু পেমেন্ট অবকাঠামো নিয়ে নিরাপত্তাগত সংশয় প্রকাশ করেছে; অন্যদিকে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কও সব জায়গায় মসৃণ নয়। বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যঘাটতি মেটাতে কারেন্সি-সোয়াপ ব্যবস্থাও প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ‘এক বোতামে ডলার বাদ’—এমন কোনো জাদুর যন্ত্র এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু দরজাটি খুলেছে।

রাশিয়া ও চীনের বাণিজ্য দেখলে বিষয়টির একটি নমুনা বোঝা যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বড় অংশ এখন ইউয়ান ও রুবলে নিষ্পত্তি হচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়ার কাছে এটি পছন্দের চেয়ে প্রয়োজন হয়ে উঠেছে বেশি। কিন্তু প্রয়োজন থেকেই তো অনেক সময় নতুন ব্যবস্থা জন্ম নেয়। ব্রিকস সেই ছোট ছোট দ্বিপক্ষীয় পথকে এখন বড় একটি বহুপক্ষীয় সড়কে পরিণত করতে চাইছে।

সড়কটির নাম হয়তো ভবিষ্যতে ‘ব্রিকস পে’ হবে না। হয়তো কোনো ঝলমলে নামই থাকবে না। ভারতের ইউপিআই, ব্রাজিলের পিক্স, বিভিন্ন দেশের দ্রুত পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা এবং ব্যাংকিং মেসেজিং ব্যবস্থা—এসব যদি একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে শেখে, তাহলে ভারতীয় আমদানিকারককে ব্রাজিল থেকে পণ্য কিনতে প্রতিবার প্রথমে রুপি ডলারে, তারপর ডলার রিয়ালে বদলাতে নাও হতে পারে।

দুই দেশের টাকা দুজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে। টাকারও অনুবাদক কম লাগবে। এতে সময় ও খরচ কমতে পারে। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের ২০২৬ সালের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের বড় সমস্যা এখনো উচ্চ খরচ, ধীরগতি এবং বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থার মধ্যে সীমিত আন্তঃসংযোগ। প্রযুক্তি এগোলেও আইনি কাঠামো, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত মানের পার্থক্য বড় বাধা হয়ে আছে। অর্থাৎ ব্রিকস যে সমস্যাটি ধরেছে, সমস্যাটি বাস্তব। তবে সমাধানটিও কঠিন।

ডলারের বিরুদ্ধে ব্রিকসের এই নতুন আগ্রহের আরেকটি নাম—নিষেধাজ্ঞার ভয়। নয়া দিল্লি ঘোষণায় সদস্যদেশগুলো একতরফা শুল্ক, অশুল্ক বাধা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেই। কূটনীতির ভদ্রলোকেরা সাধারণত ঘরে হাতি থাকলেও বলেন, ‘একটি বড় প্রাণী দেখা যাচ্ছে।’ কিন্তু কার দিকে ইঙ্গিত, তা বুঝতে খুব বেশি অভিধান লাগে না।

ট্রাম্প প্রশাসনের ছায়াটিও তাই নয়া দিল্লির টেবিলে ছিল। ওয়াশিংটন ডলারকে শুধু মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে না। ডলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের গভীরতম বন্ডবাজার, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের বিরাট ক্ষমতা। যে দেশের ব্যাংকিং লেনদেন ডলার ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়, তার ওপর মার্কিন আইনের প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে এসে পড়ে। রাশিয়া, ইরানের অভিজ্ঞতা ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সামনে সেই বাস্তবতা আরও প্রকট করেছে। তাই ডি-ডলারাইজেশন কথাটিকে শুধু ‘আমেরিকাবিরোধিতা’ দিয়ে বোঝা ভুল হবে। এর একটি অংশ রাজনৈতিক। আরেকটি অংশ নিছক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—একটি মুদ্রা ও একটি আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

কিন্তু এখানেই আরেকটি মজার দৃশ্য। যে ব্রিকস ডলারের বাইরে হাঁটার রাস্তা খুঁজছে, তার নিজের ব্যাংকের পকেটেই এখনো সবচেয়ে বেশি ডলার। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) ২০২৬ সালের বিনিয়োগ উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটির সক্রিয় ঋণপোর্টফোলিওর প্রায় ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল ডলারভিত্তিক। চীনা রেনমিনবিতে ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার র‌্যান্ডে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভারতীয় রুপিতে মাত্র ১ শতাংশ। অথচ ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ বলেছেন, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানো তাদের নতুন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। নয়া দিল্লি ঘোষণাতেও এনডিবিকে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

এই একটি পরিসংখ্যানই ব্রিকসের বর্তমান অবস্থাটি সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। স্বপ্ন আছে। বাড়ির নকশাও হয়েছে। কিন্তু ইট এখনো ডলারে কেনা হচ্ছে। ডলারকে সরানো এত কঠিন হওয়ার কারণও এখানে। আইএমএফের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বের ঘোষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল মার্কিন ডলারে। ইউরোর অংশ ২০ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর চীনা রেনমিনবি—যাকে ডলারের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করা হয়—তার অংশ মাত্র ১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ ডলার এখনো বটগাছ। ব্রিকস কয়েকটি নতুন চারা লাগাচ্ছে। চারাগাছ দেখে বটগাছ ভয় পাবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু চারাগাছকে অস্বীকার করারও কারণ নেই। আর এখানেই ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন আগের অনেক সম্মেলনের চেয়ে আলাদা। আগে কথাবার্তার মধ্যে একটি বড় রাজনৈতিক স্বপ্ন ছিল—পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বিকল্প কিছু তৈরি করা। এবার সেই স্বপ্ন একটু নেমে এসেছে মাটিতে। ‘একটি নতুন বিশ্বমুদ্রা বানাব’—এই মহৎ এবং প্রায় অসম্ভব বাক্যের বদলে এসেছে ছোট ছোট শব্দ—ইন্টারঅপারেবিলিটি, লোকাল কারেন্সি, ডিজিটাল পেমেন্ট, সেটেলমেন্ট, মেসেজিং সিস্টেম। বিপ্লবের ভাষা থেকে ব্রিকস যেন প্লাম্বারের ভাষায় এসেছে। আর অর্থনীতিতে অনেক সময় প্লাম্বারই বেশি প্রয়োজনীয়।

নয়া দিল্লিতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। ব্রিকস এখন পাঁচ দেশের ক্লাব নয়। বিস্তৃত জোটে এখন ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব রয়েছে। একই টেবিলে বড় জ্বালানি উৎপাদক, বড় জ্বালানি আমদানিকারক, বিশ্বের বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্র এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ভোক্তা অর্থনীতি বসছে। এই বৈচিত্র্য ব্রিকসের শক্তিও, আবার দুর্বলতাও।

কারণ চীন যদি ভারত থেকে কম কেনে কিন্তু ভারত চীন থেকে অনেক বেশি কেনে, সেই বাণিজ্যের নিষ্পত্তি কোন মুদ্রায় হবে—এ প্রশ্নটি বক্তৃতা দিয়ে মেটে না। অতিরিক্ত রুপি নিয়ে চীনা রপ্তানিকারক কী করবে, কিংবা অতিরিক্ত ইউয়ান ভারত কোথায় ব্যবহার করবে—এর উত্তর লাগবে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য টেকসই করতে তাই গভীর বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, সোয়াপ লাইন, বিনিয়োগের সুযোগ এবং মুদ্রার যথেষ্ট রূপান্তরযোগ্যতা প্রয়োজন। তার ওপর আছে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা।

নয়া দিল্লি চায় ব্রিকস শক্তিশালী হোক, কিন্তু সেটি যেন ‘চীনের ব্রিকস’ না হয়ে যায়। বেইজিং আবার ‘গ্রেটার ব্রিকস’-এর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সংযোগ আরও গভীর করতে চায়। শি জিনপিং এবারের সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সেবা বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতিত্বও যাবে চীনের হাতে। ফলে ডি-ডলারাইজেশনের প্রশ্নটি সামনে যত এগোবে, আরেকটি প্রশ্ন তত বড় হবে—ডলারের জায়গা কমলে সেখানে কার প্রভাব বাড়বে? বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য না হলেও ২০২১ সাল থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়ন ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার; ২০২৬ সালেও বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। আগস্টে এনডিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঢাকা সফরে নতুন রেল, বিমানবন্দর কার্গো হাব, সড়ক ও জ্বালানি প্রকল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের পাণ্ডা বন্ড ইস্যুতে সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

ফলে ব্রিকসের আর্থিক অবকাঠামো সত্যিই যদি স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক লেনদেনের দিকে যায়, বাংলাদেশের মতো ডলার-চাহিদাসম্পন্ন আমদানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে ভবিষ্যতে নতুন কিছু বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে বিকল্প মানেই ডলার ত্যাগ নয়। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বৈদেশিক ঋণ, রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ডলার এত গভীরভাবে যুক্ত যে বাস্তববাদী নীতি হবে বিকল্প দরজা খোলা রেখে মূল দরজাও চালু রাখা। এই জায়গাতেই হয়তো এবারের ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

ডলার আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে তার চাকরি নেই—এমন কিছু ঘটছে না। ওয়াশিংটনের ছাপাখানা বন্ধ হচ্ছে না। নিউইয়র্কের বন্ডবাজারেও তালা পড়ছে না। পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রাতারাতি তাদের ডলার জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে না।

কিন্তু একটি পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় উদীয়মান অর্থনীতি এখন ভাবছে, কেন প্রতিটি রাস্তা নিউইয়র্ক হয়ে যাবে। দিল্লি থেকে ব্রাসিলিয়া যেতে মাঝখানে ওয়াশিংটনে টিকিট কাটতেই হবে কেন। বেইজিং থেকে মস্কো, জাকার্তা থেকে আবুধাবি, কিংবা ভবিষ্যতে ঢাকা থেকে সাংহাই—লেনদেনের আরও সরাসরি রাস্তা থাকতে পারে কি না, সেই হিসাব শুরু হয়েছে।

ডলারের সাম্রাজ্য সম্ভবত কোনো এক সকালে ভেঙে পড়বে না। ইতিহাস সাধারণত এত সিনেমাটিক নয়। সাম্রাজ্যের পরিবর্তন হয় ধীরে। প্রথমে একটি ছোট রাস্তা তৈরি হয়। তারপর আরেকটি। পুরোনো মহাসড়কে তখনো গাড়ির ভিড় থাকে। কিন্তু মানুষ আবিষ্কার করে—ওই মহাসড়ক ছাড়া বাড়ি ফেরার আরও পথ আছে। নয়া দিল্লিতে ব্রিকস সম্ভবত সেই বিকল্প পথের মানচিত্রটিই এবার একটু স্পষ্ট করে আঁকল।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ