ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, ইতিহাস আড়ালের অভিযোগে উদীচীর প্রতিবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আড়াল এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সংযোজনের অভিযোগে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে উদীচী বলেছে, সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও স্মারক বাদ দেওয়া এবং মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে বিতর্কিত অবস্থান নেওয়া জিন্নাহর ছবি সেখানে স্থান দেওয়ার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। সংগঠনটির দাবি, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ দেওয়া বা তার উপস্থাপনা পরিবর্তন করা কোনো সাধারণ সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে না; বরং এর মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
উদীচীর নেতারা বলেন, বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি পর্যায়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসু ভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও তারা স্মরণ করিয়ে দেন।
বিবৃতিতে জিন্নাহর ছবি সংযোজন নিয়েও প্রশ্ন তোলে উদীচী। সংগঠনটির ভাষ্য, ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে জিন্নাহ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন একজন রাজনৈতিক নেতার ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় যুক্ত করার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছে তারা। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল-স্মারক বাদ দেওয়ার অভিযোগও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।
উদীচী আরও বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর যে ঐতিহাসিক ভূমিকা বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত, সেই ইতিহাসকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা শহীদদের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননাকর। সংগ্রহশালার কোনো উপাদান রাখা বা না রাখার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দকে কারণ হিসেবে দেখানোর বক্তব্যও ইতিহাস ও জনগণের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না বলে মন্তব্য করেছে তারা।
বিবৃতিতে ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গণসংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট দলিল-স্মারক যথাযথভাবে পুনঃস্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের আত্মত্যাগের স্মারক সংগ্রহশালায় যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে উদীচী। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শেষে উদীচী বলেছে, একটি জাতির সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আড়াল করার চেষ্টা তার আত্মপরিচয়কে দুর্বল করার শামিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় উত্তরাধিকার। তাই এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
মতামত দিন