দুই দশকের ক্যারিয়ারে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি মেসি
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম তিক্ত ও বর্ণময় দ্বৈরথ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, আর একই ম্যাচে শতাব্দীর সেরা গোল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে তরুণ মাইকেল ওয়েনের বিস্ময়কর একক গোল আর ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড— এই লড়াইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ই ফুটবল-লোকগাথার অংশ। অথচ অবাক করা সত্য হলো, এই মহাদ্বৈরথের সবচেয়ে বড় নামটিই কখনো এর স্বাদ পাননি। প্রায় দুই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সিনিয়র পর্যায়ে একবারও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি লিওনেল মেসি।
অবশেষে সেই অপেক্ষা ফুরোচ্ছে। আগামী বুধবার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১টায়) আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড— আর ৩৯ বছর বয়সে, সম্ভবত ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে, প্রথমবারের মতো থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে মাঠে নামবেন মেসি।
এক লাল কার্ডের খেসারত
মেসির ইংল্যান্ড-ভাগ্যের গল্পটা শুরু তার আন্তর্জাতিক অভিষেকের নাটকীয়তা দিয়ে। ২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন ১৮ বছরের মেসি। কিন্তু মাঠে নামার এক মিনিটও পেরোয়নি, সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যা এক অবিশ্বাস্য অভিষেক-স্মৃতি হয়ে আছে।
সেই লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞার খেসারতই মেসিকে দিতে হয় ইংল্যান্ড-প্রশ্নে। কারণ ওই বছরেরই ১২ নভেম্বর জেনেভায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে আর্জেন্টিনা। মেসির অভিষেকের পর দুই দলের একমাত্র সাক্ষাৎ সেটিই। রোমাঞ্চকর সেই ম্যাচে ওয়েইন রুনির গোল আর শেষ দিকে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। মেসি ছিলেন দর্শক।
দুই দশকে আর দেখা হয়নি
এরপর কেটে গেছে প্রায় ২১ বছর। বিশ্বকাপ, কোনো টুর্নামেন্ট, এমনকি প্রীতি ম্যাচেও আর মুখোমুখি হয়নি ফুটবলের এই দুই পরাশক্তি। সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে— কোয়ার্টার ফাইনালে দুই দলের দেখা হওয়ার মঞ্চ প্রায় প্রস্তুত ছিল, মেক্সিকোকে হারিয়ে নিজেদের কাজটা সেরে রেখেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ ষোলোতে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড, ভেস্তে যায় সেই সম্ভাবনা। মাঝে ২০২৩ সালে দুই দেশের ফুটবল ফেডারেশন একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের আলোচনাও চালিয়েছিল, তবে তা আর মাঠে গড়ায়নি।
ফলে ম্যারাডোনা-উত্তর যুগে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা হয়েও এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের উত্তাপ কখনো মাঠে অনুভব করা হয়নি মেসির। ক্লাব ক্যারিয়ারে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে বহু স্মরণীয় রাত কাটালেও — চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে — ইংল্যান্ড জাতীয় দল থেকে গেছে অধরাই।
সেমিফাইনালে ইতিহাসের হাতছানি
এবারের সেমিফাইনাল তাই শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, মেসির ক্যারিয়ারের একটি অপূর্ণ অধ্যায় পূরণেরও উপলক্ষ। চলতি আসরে আট গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে থাকা মেসি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও নিয়ে গেছেন ২১-এ। যদিও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোল না পাওয়ায় টানা নয় ম্যাচে গোলের অভূতপূর্ব ধারা থেমেছে, ম্যাক আলিস্টারের গোলে অ্যাসিস্ট করে ঠিকই জয়ে ভূমিকা রেখেছেন অধিনায়ক।
অন্যদিকে জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেইনদের ইংল্যান্ডও ছুটছে ছয় দশকের শিরোপা-খরা ঘোচানোর লক্ষ্যে — ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তাদের। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের জয়ে বেলিংহামের জোড়া গোলই গড়ে দিয়েছে পার্থক্য।
ম্যারাডোনার হাত, ওয়েনের দৌড়, বেকহ্যামের লাল কার্ড— আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মানেই ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়। এবার সেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজের নাম লেখানোর সুযোগ মেসির সামনে। ফুটবল-রোমান্টিকরা নিশ্চয়ই চাইবেন, দুই দশকের অপেক্ষার এই ম্যাচও যেন জায়গা করে নেয় সেই লোকগাথায়।
মতামত দিন