বাংলাদেশ সীমান্তে সহকর্মীদের ওপর গুলি বিএসএফ জওয়ানের, নিহত ২
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের নিজস্ব ঘাঁটিতেই এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রক্তাক্ত ঘটনা ঘটেছে। বিএসএফের নিজ সহকর্মীদের ওপরই গুলি চালিয়েছেন এক জওয়ান। সেই এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন বাহিনীর দুই সদস্য, আর পায়ে গুলি লেগে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও একজন।
স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলের এই ঘটনায় বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বিএসএফ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে চরম চাঞ্চল্য ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বৈষ্ণবনগর থানা এলাকার ১৭ নম্বর মাইল স্থানে বিএসএফের ৭১ এবং ১১৯ নম্বর ব্যাটালিয়নের সমন্বিত সদর দপ্তরের ভেতর বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক ৪টা নাগাদ এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটে। মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিং পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও কর্মকর্তা সূত্র জানায়, অভিযুক্ত জওয়ান শিবম কুমার মিশ্র সদর দপ্তরের প্রধান প্রবেশদ্বারে দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রিকে আচমকা কাবু করেন। এরপর তাঁর কাছ থেকে সার্ভিস রাইফেলটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢোকেন। ব্যারাকে ঢুকে তিনি এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন, যেখানে ডিউটি শেষ করে অনেক সদস্য বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। গুলিতে ৩ জওয়ান মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত সদস্যরা হলেন—বিহারের সারান জেলার বাসিন্দা অজয় কুমার সিং (৫১) এবং মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলি জেলার বাসিন্দা সুরেশ দুর্গু আম্বেদকর (৩৭)।
এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বিএসএফের হেড কনস্টেবল বিকাশ ব্রহ্ম (৪৪)। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাসিন্দা বিকাশের পায়ে গুলির আঘাত লেগেছে। চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে মাত্র বিশ্রাম নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই অনবরত গুলির শব্দ শুনে খাটের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিই। আমার চোখের সামনেই ৭১ নম্বর ব্যাটালিয়নের দুই সহকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হন এবং আমার গায়েও গুলি লাগে। পরে জানতে পারি তাঁরা মারা গেছেন। যিনি গুলি চালিয়েছেন, সেই শিবম কুমার মিশ্র ১১৯ নম্বর ব্যাটালিয়নের সদস্য।’
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিবম কুমার মিশ্র ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা। পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানান, বিএসএফের থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মিশ্রের বিরুদ্ধে আগে কোর্ট-মার্শাল হয়েছিল এবং তাঁকে হেফাজতে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি বিএসএফের সেই অভ্যন্তরীণ আটক কেন্দ্র থেকে মুক্তি পান।
একই নামে এক কনস্টেবল শিবম কুমার মিশ্রের বিরুদ্ধে প্রায় এক বছর আগে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে বিএসএফ ক্যাম্পে তর্কাতর্কির জেরে সিনিয়র হেড কনস্টেবল রতন সিং শেখাওয়াতকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল বলে সে সময়কার প্রতিবেদনে দেখা যায়। বর্তমান ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিশ্রের কোর্ট-মার্শাল ওই ঘটনার জেরেই হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও দুটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি একই কি না তা এখনো স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযুক্ত জওয়ান শিবম কুমার মিশ্রকে আপাতত আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার পর পরই বিএসএফ সদর দপ্তরে পুলিশের একটি বড় দল পৌঁছায়। কোর্ট-মার্শালের পর নেওয়া শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার চরম প্রতিশোধ নিতেই মিশ্র এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
এদিকে বিএসএফের মালদা সেক্টরের ডিআইজি সুরেন্দ্র কুমার ঝা জানিয়েছেন, ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং নিহত ও আহত জওয়ানদের পরিবারকে ইতিমধ্যে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আইএএনএস, টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া
মতামত দিন