ট্রাম্পের ইরান হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নাকি ইসরায়েলের ইচ্ছাপূরণ?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য দেশের শাসন বদলাতে যুদ্ধে জড়াবে না। তার ভাষ্য ছিল, তথাকথিত রাষ্ট্রগঠনকারীরা যতগুলো দেশ গড়েছে, তার চেয়ে বেশি দেশ ধ্বংস করেছে। নিজের আগ্রাসী পূর্বসূরিদের কঠোর সমালোচনাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ঘোষণার এক বছর না পেরোতেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গেল। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক হামলার নির্দেশ দিলেন। আর সেই হামলার ভাষা ও যুক্তি হুবহু সেই নব্য রক্ষণশীল হস্তক্ষেপবাদীদের মতো, যাদের ট্রাম্প নিজে বছরের পর বছর ধরে সমালোচনা করে আসছিলেন।
এখানেই বড় প্রশ্নটা—এই যুদ্ধ কি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে, নাকি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চাওয়া পূরণ করতে?
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
আল জাজিরার প্রতিবেদনে একাধিক ইরান-বিশেষজ্ঞ পরিষ্কার বলছেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষিত রাজনৈতিক মতাদর্শ, নীতিগত অবস্থান কিংবা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক নেগার মোরতাজাভি বলছেন, এটি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্ররোচনায় শুরু করা একটি বেছে নেওয়া যুদ্ধ। তার কথায়, দুই দশক ধরে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল, আর অবশেষে তারা সেটা আদায় করেই ছাড়ল। নিজেকে শান্তির প্রেসিডেন্ট দাবি করা ট্রাম্পের এই হামলার পদক্ষেপকে তিনি রীতিমতো বিদ্রূপাত্মক বলেও অভিহিত করেছেন।
দুই দশকের পুরনো চাপের গল্প
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করে আসছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে। তেহরান এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ইরান সত্যিই পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ তাদের হাতে নেই।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালায়। ট্রাম্প দাবি করেন পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু এরপরই নেতানিয়াহু নতুন হুমকির দিকে মনোযোগ দেন—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। গত অক্টোবরে তিনি দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা একদিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলেও পৌঁছাতে পারবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্পও হুবহু একই দাবি করেন। যদিও এর পক্ষে কোনো প্রকাশ্য পরীক্ষা বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।
কূটনীতির দরজা বন্ধ হলো হঠাৎ করেই
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মনে হচ্ছিল যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটছে দুই পক্ষ। ওমানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান তিন দফা বৈঠকে বসে। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মধ্যস্থতাকারী ও ইরানি কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ বৈঠকটি ইতিবাচক ছিল এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু এই আলোচনার ঠিক মাঝপথেই হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলছেন, নেতানিয়াহু সবসময়ই চেয়েছেন কূটনৈতিক সমাধান না হোক। তিনি আশঙ্কা করছিলেন ট্রাম্প হয়তো সত্যিই একটা চুক্তিতে পৌঁছে যাবেন। তাই আলোচনার মাঝখানে যুদ্ধ শুরু হওয়াটা নেতানিয়াহুর জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয়। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত এক সামরিক সংঘাতে টেনে নামাতে পারে।
আমেরিকার মানুষ কি চেয়েছিল এই যুদ্ধ?
ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মার্কিন জনগণের মধ্যে নতুন সংঘাতে জড়ানোর ক্লান্তি এখন স্পষ্ট। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ আমেরিকান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমর্থন করেন। তবুও যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
ট্রাম্পের নিজের আন্দোলনের কিছু সমর্থকও এই যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান না থাকলে হিজবুল্লাহ থাকত না, আর লেবানন সীমান্তে সমস্যাও থাকত না। এর জবাবে রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন সরাসরি বলেন, লেবানন সীমান্তে আমেরিকার কোনো সমস্যা নেই—এটা ইসরায়েলের সমস্যা, আমেরিকার নয়। কংগ্রেসওম্যান রাশিদা ত্লাইব আরও কড়া ভাষায় বলেছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের বর্ণবাদী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনীর মতামত উপেক্ষা করছেন।
ট্রাম্প অবশ্য বলছেন, এই হামলার লক্ষ্য ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি দেওয়া থেকে বিরত রাখা। তিনি স্বীকার করেছেন, এই যুদ্ধে মার্কিন সেনা হতাহতের ঝুঁকি আছে। তার কথায়, ‘যুদ্ধে এমনটা প্রায়ই ঘটে।’ আর দাবি করছেন, এই অভিযান ভবিষ্যতের জন্য যুগান্তকারী হতে যাচ্ছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে