ইরানের সঙ্গে প্রথম দফা হামলা-পাল্টা হামলার পর ‘কঠোর জবাবের’ হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ইরানকে ‘কঠোরভাবে’ আঘাত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার পর তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। একই সময়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে চলমান চাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে পাল্টা অবরোধ অব্যাহত রেখেছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ইরান-নিয়ন্ত্রিত লারাক দ্বীপে হামলা চালায়। এর পরপরই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দেয়।
এতে বড় ধরনের সংঘাত আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করব। এর জবাব দেওয়া হবে।”
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে ইরান যাতে মাইন স্থাপন করতে না পারে, তা ঠেকাতে লারাক দ্বীপে থাকা ইরানের রকেট লঞ্চারে হামলা চালানো হয়েছে।
এর জবাবে ইরান জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তেহরান দাবি করে, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ছিল তাদের লক্ষ্য। তবে সোমবার পরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সংলাপের আহ্বান জানান।
কিরগিজস্তানে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমরা সমঝোতা ও বোঝাপড়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
আমরা বিশ্বাস করি, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের বা এই অঞ্চলের কারও স্বার্থে নয়।” তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হলো সংলাপ ও সহযোগিতা।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রোববার লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় “ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি” হয়েছে।
তবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করা হয়েছে। কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, তবে এগুলোর উৎস সম্পর্কে কিছু জানায়নি।
ইরান আরও দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
আবুধাবি জানিয়েছে, তারা তাদের জলসীমার ওপর একটি ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি তারা ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সোমবার সন্ধ্যায় আইআরজিসি আরও একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে। একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না।
সোমবার রাতে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা জানায়, হরমুজ প্রণালি থেকে বেরিয়ে আসা একটি তেলবাহী ট্যাংকার ওমানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় তিনটি “অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের” আঘাতের শিকার হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
‘চাপ অব্যাহত থাকবে’
কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতির পর এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
সোমবার এর আগে ট্রাম্প ইরানকে “ব্যর্থ রাষ্ট্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, দেশটির সামরিক শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে এবং নেতৃত্ব পুরোপুরি বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
উত্তর ক্যারোলিনায় জি২০ বৈঠকের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা চাপ অব্যাহত রাখব এবং এখানে ইতোমধ্যে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে।”
তিনি জানান, এই চাপ প্রয়োগের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন “কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে” আসতে পারে।
ইরানও হরমুজ প্রণালি অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং মার্কিন ভোটারদের জন্য জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বছরে রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
ছয় মাস পরও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” রয়েছে প্রণালিটি।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, তারা নৌপথ থেকে বিস্ফোরক অপসারণের কাজ শেষ করেছে।
তবে ইরান দাবি করছে, সমুদ্রপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়েছে।
সোমবার আইআরজিসি জানায়, একটি “বেপরোয়া” তেলবাহী ট্যাংকার অবৈধ পথে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় দুটি মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এ দাবি “অপতথ্য” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, “হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজ মাইনে আঘাত করেনি।”
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কয়েক মাস ধরে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তবে এর আগে হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।
সম্প্রতি ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চুক্তিতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, “সমাধান সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও সরল—যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যেতে হবে।”
তিনি বলেন, “তাহলে সবকিছু আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
মতামত দিন