হরমুজ দখলে ট্রাম্পের ‘মিত্র জোট’ গঠনের আহ্বান, ফ্রান্সের সাফ না
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবরোধ মোকাবিলায় একাধিক দেশকে নিয়ে একটি ‘মিত্র জোট’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ফ্রান্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এ অঞ্চলে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের ১৫তম দিনেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে কাজ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এ উদ্যোগে যোগ দেবে।
ফ্রান্সের সরাসরি প্রত্যাখ্যান
তবে ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর পুরোপুরি অস্বীকার করে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ফ্রান্স নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে না এবং তাদের বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘না। আমাদের বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই রয়েছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত— রক্ষণাত্মক ও সুরক্ষামূলক।’
ফ্রান্সের এই অবস্থান ট্রাম্পের কথিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের দাবির ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ট্রাম্প একই পোস্টে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার প্রায় পুরোটা ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে ইরান এখনও ড্রোন, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জলপথে হামলা চালাতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে উপকূল বরাবর বোমা হামলা চালাবে এবং ইরানি নৌযান ধ্বংস করবে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি ট্রাম্পের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, হরমুজ প্রণালী সামরিকভাবে বন্ধ করা হয়নি, বরং কেবল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে সরাসরি এসকর্ট দেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালী কেবল শত্রু ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রভাবশালী এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজাই মন্তব্য করেন, কোনো মার্কিন জাহাজের উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।
ভারত ও তুরস্ককে ছাড়
এর মধ্যেই ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনার পর ইরান কিছু জাহাজকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে। দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী এলপিজি ট্যাংকার এবং একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজ নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা জানিয়েছেন, দুটি ভারতীয় ট্যাংকার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরাসরি আলোচনার ফলেই এ অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তুরস্কের সঙ্গেও আলোচনার পর একটি তুর্কি জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আরও প্রায় ১৪টি তুর্কি জাহাজ ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হয়। এই গ্যাস নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মতে, এই পথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ভারত ইতোমধ্যে রান্নার গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশটিতে প্রায় ৩৩ কোটি এলপিজি-নির্ভর পরিবার রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, মানবিক সহায়তার পণ্য যদি নিরাপদে এই প্রণালী দিয়ে যেতে না পারে, তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে।
সামরিক সমাধান নিয়ে সংশয়
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়ার কার্যকর কোনো সামরিক পথ নেই।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের জোট গঠনের আহ্বান আসলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল মাত্র।
তার মতে, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া যুদ্ধজাহাজ পাঠানো মানে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক জাহাজগুলোকে ইরানের তুলনামূলক সস্তা কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া।
সূত্র: আল-জাজিরা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে